প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ২৪, ২০২৬, ৫:০১ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ১১, ২০২০, ৫:৪৯ এ.এম
কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইরানের ইসলামি বিপ্লব

শেখ আল মাসুদ,ইরান ।।
সুরা মুহাম্মাদ,আয়াত# ৩৮
“ জেনে রাখ,তোমরাই তো তাঁরা যাদের আল্লাহর পথে ব্যয় করতে আহবান করা হয়, তখন তোমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক কার্পন্য করে সে নিজের জন্যই কার্পন্য করে; আল্লাহ অমুখাপেক্ষী এবং তোমরা(তাঁরই প্রতি) মুখাপেক্ষী; তোমরা যদি বিমুখ থাক তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য সম্প্রদায়কে প্রতিষ্টিত করবেন এবং তাঁরা তোমাদের মত হবে না”(১)।
ব্যাখ্যাঃ(১) ইবনে মারদুইয়্যা হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী থেকে বর্ননা করেছেন, একদিন রাসুল(সাঃ) এই আয়াত পাঠ করলে তাঁকে প্রশ্ন করা হলঃ ‘তাঁরা কারা?’ তখন তিনি বললেন ,’তাঁরা হল পারস্যবাসী।যদি দ্বীন সুরাইয়া তারকাতেও পৌছায় তবুও পারস্যের একদল তা হস্তগত করবে।‘আবু হুরাইরা সুত্রেও অনুরুপ হাদিস বর্নিত হয়েছে।তাতে বলা হয়েছে,আল্লাহর রাসুল(সাঃ) সালমান ফারসীর কাঁধে হাত দিয়ে তা বলেছেন(তাফসীরে দুররে মানসুর,৬ষ্ট খন্ড,পাতাঃ৬৭)।(সুপ্রিয় পাঠক,আমরা জানি ১৯৭৯ সালে ইরানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী(রঃ)এর নেতৃ্ত্বে ইসলামী বিপ্লব হয়েছে এবং সেখানে শরিয়তী আইন কার্যকর হয়েছে।আর যুক্তসঙ্গত ভাবে কোরানের আয়াতের সত্যতা প্রমানিত হয়েছে।
রাসুল(সাঃ) বলেছেন, “ প্রাচ্য হতে এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটবে যিনি ইমাম মাহদীর(আঃ) শাসনের পথ প্রশস্ত করবেন।( তিরমিজি শরিফ,সুনানে ইবনে মাজা,সুনানে বায়হাকী,মুসনাদে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল)।হাকেম নিশাপুরি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মুস্তাদ্রাক আস সাহিহাইন’-এ একটি উল্লেখ করেছেনঃ “প্রাচ্যে হুসাইনের(আঃ) এক বংশধরের আবির্ভাব ঘটবে,তার অগ্রসাত্রার পথে যদি একটি পর্বতকেও এনে রাখা হয় তিনি তাও মাড়িয়ে অগ্রসর হবেন”।তাব্রানীও তাঁর ‘আল কাবীর’ গ্রন্থেও এধরনের হাদিস উল্লেখ করেছেন। আমরা জানি,হযরত ইমাম খোমেনী(রঃ) হজরত ফাতিমার(সা আ) মাধ্যমে ইমাম হুসাইনের বংশধারার এক অবিসাংবিদিত পুরুষ।এই হাদিসের আলোকে দেখা যায়,এই পারমানবিক বিশ্বে একটি ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্টাতা ইমাম খোমেনীর(রঃ) বিপ্লবী সাফল্যকে রুখে দেবার জন্য বিশ্বের সব পরাশক্তি অসংখ্য বাধা সৃষ্টি করেছিল,অসংখ্য ষড়যন্ত্র করেছে,কিন্তু সবই ব্যর্থ হয়েছে।পরাশক্তিবর্গ ইরানের অগ্রযাত্রাকে কোন ভাবেই রুখতে পারেনি।অতি সাম্প্রতিক সময়ে ৬ জাতি গোষ্ঠির সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে,সেটাও ইরানের সফলতার একটি প্রমান।এই চুক্তির পর আশা করা যায় ইরান আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে।
মধ্যযুগীয় মুসলিম চিন্তাবিদ মহিউদ্দিন আল তাবারী তাঁর গ্রন্থ ‘জাখাইর আল উকবা’তে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন।হাদিসটি হল-“আমার পরে আমার আহলে বায়েত দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হবে।প্রাচ্য দেশ থেকে এক মহাপুরুষের আবির্ভাব পর্যন্ত নান অত্যাচার-অবিচারের শিকার হবে।কাল নিশানধারী বাহিনী তাঁদের অধিকার দাবী করবে কিন্তু তাদেরকে তা দেয়া হবে না।তাই তারা যুদ্ব করবে এবং জয়ী হবে।তাদের সকল দাবী পুরন করা হবে কিন্তু আহলে বায়েতের একজনকে শাসক নিয়োগ না করা পর্যন্ত তারা কিছু গ্রহন করবে না।আহলে বায়েতের এই শাসক পৃথিবীতে ন্যায়বিচারে পরিপূর্ণ করবেন।অনেক আগে পৃথিবী অন্যায় অবিচারে পরিপুর্ন ছিল।কাজেই যে ব্যক্তি এই জামানার সন্দ্বান পাবে সে যেন তাঁদের সাথে যোগ দেয়,এমন কি বরফের উপর হামাগুড়ি দিয়ে হলেও যেন সে আসে”।এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ইমাম খোমেনি(রঃ) তাঁর অসিয়তনামায় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি হাদিসে সাকালাইন( ২টি ভারী বস্তু-কুরান ও আহলে বায়েত আঃ) দিয়ে তাঁর অসিয়তনামা শুরু করেছেন।এই হাদিসে রাসুল(সাঃ)এর আহলে বায়েতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে এবং এতে এও বলা হয়েছে যে, ইসলামী সরকার আল্লাহর একটি আমানাত।এই আমানাত হস্তান্তর করা হবে ন্যায়নিষ্ট শাসক ইমাম মাহদীর(আঃ) কাছে।যারা উপরোক্ত হাদিসের প্রাচ্য দেশটি সম্পর্কে সন্দেহ পোষন করেন তারা নিম্নোক্ত হাদসটি পাঠ করতে পারেন-“ যখন খোরাসান থেকে কালো নিশানধারীদের আবির্ভাব হবে তখন দ্রুত তাঁদের কাছে যাও,এমনকি বরফের উপর হামাগুড়ি দিয়ে হলেও”( হাকেম নিশাপুরি ও মাকদেশী শাফেয়ী)।
তিরমিজি,ইবনে কাসির ও ইবনে হাজার আসকালানীর গ্রন্থেও একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে, “খোরাসান থেকে কাল নিশানধারীদের অভ্যুদয় ঘটবে।জেরুজালেম(এলিয়া) পৌছা অবধি তাদেরকে কোন শক্তি দমন করতে পারবে না”।আহমদ বিন সিদ্দিকী বুখারী তাঁর গ্রন্থ “ আবরাজ আল ওয়াহাম আল মাকনুন মিন কালামে ইবনে খালদুন” গ্রন্থে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন, “ যখন আমার সুন্নাহর অবমাননা করা হবে তখন এর প্রতিরক্ষাকারী হিসাবে খোরাসান থেকে কাল নিশানধারীদের আবির্ভাব ঘটবে এবং তাঁদের অগ্রযাত্রা জেরুজালেম অবধি পৌছবে”।এসব হাদিসে খোরাসানের উপর বেশ জোর দেওয়া হয়েছে এবং গন্তব্যস্থল হিসাবে জেরুজালেমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।এখানে স্মরন করা যেতে পারে যে,ইমাম খোমেনী(রঃ) ফিলিস্তিনের বুক থেকে বিষ ফোড়া ইজ্রাইলের অপসারনের আহবান জানিয়েছেন এবং আল কুদস(মুসলমানদের ১ম কেবলা) মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি রমজানের শেষ শুক্রবারকে “ আন্ররজাতিক আল কুদস দিবস” হিসাবে ঘোষনা দিয়েছেন।হাদিস শরিফে শুধু খোরাসানের কথাই উল্লেখ করা হয়নি,কোম,রেই(আধুনিক তেহরান),হামেদান ইত্যাদি জায়গার কথাও উল্লেখ আছে।এধরনের কয়েকটি হাদিস নিম্নরুপঃ
“তালেকানের জন্য সুসঙ্গবাদ,যেখানে রয়েছে সম্পদ।এই সম্পদ কোন সোনা বা রুপা নয়,এ হল সেখানকার জনগন যাদের রয়েছে আল্লাহর উপর দৃঢ় ঈমান তারা হবে ইমাম মাহদীর(আঃ) সমর্থক( ঐতিহাসিক আসেম আল কুফীর “আল ফুতুহ” এবং ৬ষ্টদশ শতকের সুন্নি দার্শনিক মোত্তাকী আল হিন্দির ‘আল বুরহান ফি আলামাতে সাহেব আল যামান”)।শিয়া আলেমদের মধ্যে আল্লামা বাকের মাজলিশ তাঁর বিহারুল আনোয়ার গ্রন্থে ৭ম ইমাম মুসা ইবনে জাফর আল কাজেমের(আঃ) বরাত দিয়ে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন-“ কোম থেকে এক ব্যক্তির আবির্ভাব হবে যিনি জনগনকে সত্যের দিকে আহবান জানাবেন।তার চারপাশে এমন লোকজনের ভীড় হবে যারা হবে ইস্পাত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী।সকল ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবেলায় তারা ওটল থাকবে এবং যুদ্ব তাঁদের কাবু করতে পারবে না”।
গত ৩ দশকের ঘটনা প্রাবাহ একটু খেয়াল করুন।ইরানের কোম নগরী থেকেই ১৯৬৩ সালে ইমাম খোমেনী(রঃ) ইসলামী বিপ্লবের ডাক দেন।১৯৬৩ সালের জুন মাসে (১৫ই খোরদাদ) মার্কিনী তাবেদার রেজা শাহ পাহলবীর প্রশাসনের বিরুদ্বে গন অভ্যুথথান হয়েছিল ইমাম খোমেনীর(রঃ) নেতৃ্ত্বে।আরো বছর পর ইরানের জনগন ইমাম খোমেনীর নেতৃ্ত্বে ইসলামী বিপ্লবের চুড়ান্ত বিজয় সম্পন্ন করে।নতুন ইসলামী সরকারকে নস্যাত করার জন্য পরাশক্তিগুলো দীর্ঘ ৮ বছর যুদ্ব চাপিয়ে দেয় ইরানের উপর।কিন্তু খোদা ভিরু ইরানী জাতী ইমাম খোমেনীর নেতৃ্ত্বে সেই যুদ্বে অবিচল থেকে বিজয় অর্জন করে।
আরও ১টি হাদিস লক্ষ্য করুনঃ” কুফাতে ইমানদারদের সংখ্যা শুন্য হয়ে পড়বে।সাপ যেমন গর্তে কুন্ডুলী পাকিয়ে ঢুকে যায় ঠিক তেমনী জ্ঞান অন্ত্ররহিত হয়ে পড়বে।তখন কোম নগরীতে জ্ঞানের আবির্ভাব ঘটবে।জ্ঞান ও প্রতিভার খনি হিসাবে এই কোম নগরী মর্যাদাবান হবে।পৃথিবীর বুকে কোন নির্যাতিত ব্যক্তিই ইমানের দৃঢ়তায় দুর্বল হবে না,এমন কি পর্দার অন্তরালে মহিলারাও।এই ঘটনা ঘটবে ইমাম মাহদীর(আঃ) আবির্ভাবের আগে”।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: সফিকুল ইসলাম
লিটন মঞ্জিল, ভোলা-বরিশাল সড়ক, লক্ষ্মীপুর।
ফোন: +৮৮ ০১৭১২ ৯৭ ৫৬ ০৫,
ই-মেইল: nagorikkagoj@gmail.com
Copyright © 2026 Nagorik Kagoj. All rights reserved.