ডেঙ্গু এবং বাংলাদেশ

শেখ আল মামুন,সাতক্ষীরা।।

বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে সর্বকালের সর্বোচ্চ রিপোর্ট ছিল ২০১৯ সালে। উচ্চ সংখ্যা ক্ষেত্রে এশিয়াতে ছিল বাংলাদেশ (১,০১,০০০), মালয়েশিয়া (১,৩১,০০০), ফিলিপাইন (৪,২০,০০০), ভিয়েতনাম (৩,২০,০০০)। 

২০২০-এর মাঝামাঝিতে এসে আবারো বাংলাদেশে ডেঙ্গুর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও সারাদেশে এডিসের লার্ভা পাওয়া গিয়েছে এবং ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। গত বছরের মতো এ বছরও সারা বাংলাদেশ ডেঙ্গু ঝুঁকিতে রয়েছে। এবং সারা বছরের মধ্যে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ ট্রান্সমিশন সময় বর্ষা মৌসুম জুন থেকে সেপ্টেম্বর।

২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর কেস রিপোর্ট হয়েছিল ১,০১,৩৫৪টি। প্রায় ৫০ শতাংশ রিপোর্ট সমেত এ ভয়াবহতা শীর্ষে ছিল কেন্দ্রিক রাজধানী শহর ঢাকা। এবছর এ পর্যন্ত ২৯২ ডেঙ্গু টেস্ট রিপোর্ট করা হয়েছে যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১২২ শতাংশ বেশি। ‘স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশ’ এর প্রকল্প নির্বাচন কমিটি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কর্মসূচি (SEEP)কে একটি তহবিলে ভূষিত করে যা জিবিপি ৫০,০০০/- অর্থ বহন করে, যাতে গণ সচেতনতা প্রচারণা, প্রতিরোধ, এবং অন্যান্য সম্পর্কিত কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে এই ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব জনজীবনকে আরো হয়রানির মুখে ফেলেছে। উপরন্তু আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আরো কিছু আন্দোলন বিধিনিষেধ এবং অভিগম্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। বর্তমানে করোনার সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার আগমন এবং ডেঙ্গুজ্বরের বার্তায় বাংলাদেশের আসন্ন অবস্থা শোচনীয় হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে এডিস মশার লার্ভা উদ্ধার করেছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রতি বিশেষজ্ঞরা আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা শক্তিশালী এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তার সাথে তারা নাগরিকদের সতর্ক হতেও আহ্বান জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অনুযায়ী গত ১৩ জুন পর্যন্ত সারাদেশে মোট ৩১১ ডেঙ্গু রিপোর্ট নিবন্ধিত হয়েছে। ২৪৩ জন রোগী সহ বর্তমানে ঢাকা ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সর্বোচ্চ রেকর্ডসহ স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে তিন জন রোগী বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে এবং ৩০৮ জন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন।

অনেক ডেঙ্গু রোগীদের বর্তমানে বাড়িতে সেবা প্রদান করা হচ্ছে যেহেতু হাসপাতালগুলো করোনা রোগী দ্বারা পরিপূর্ণ।

জাতীয় ম্যালেরিয়া দূরীকরণ এবং এডিস মিলনের রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচীর অধীনে অধিদপ্তরের পরিচালিত একটি প্রাক-মৌসুমে জরিপ টরেছিল মার্চে, যাতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কিছু এলাকা আওতাভুক্ত ছিল এবং এটি সম্পন্ন করা হয় জুন ৬ থেকে ১৩ তারিখে। কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৬১১ টি বাড়ির মধ্যে পতঙ্গ বিজ্ঞানীরা ৩৪১ বাড়িতেই এডিস মশার লার্ভা খুঁজে পেয়েছেন। ড. আফসানা আলমগীর খান, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ন্যাশনাল ম্যালেরিয়া দূরীকরণ এবং এডিস মিলনের রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, জানান যে প্রাথমিকভাবে গৃহসূচক এবং Breteau সূচক এর তথ্য খুঁজে বের করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরো বলেন, একবার এই সূচক গণনা করা হলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মধ্যকার ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হবে। তার উদ্ধারকৃত বেশিরভাগ শূককীট গুলো ছিল গর্ত বা কাগজের বাক্সের মধ্যে বদ্ধ পানিতে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক জনাব খায়রুল বাশার বলেন, জাতীয় ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি এডিস মশার বিস্তার ঘটেছে ঢাকায়।

তিনি আরো বলেন, এই ঋতুতে ইতোমধ্যে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে যা মশার প্রজনন এর জন্য একটি উৎকৃষ্ট সময় হিসেবে বিবেচিত। সাধারণত মশার সংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি হয় জুন মাসে এবং উচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়। এবং ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে আগস্ট মাসে।

তিনি মনে করেন, মশা দমনের ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনের উচিত সচেতনতার সাথে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তিনি নাগরিকদেরকে তাদের ভাষায় বদ্ধ পানির উৎপত্তি স্থলকে চিহ্নিত এবং নির্মল করতে বলেন কেননা এটি মশার প্রজনন স্থল।

মে ১৬ থেকে ২০ এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ৯৪৬৩টি ঘর থেকে ১৮৭ টি ঘরে একটি চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে এডিসের লার্ভা উদ্ধার করেন। চিরুনি অভিযানের দ্বিতীয় পর্বের জুন ৬থেকে ১৩ এর মধ্যে ১,০৭,৬২৮টি ঘর থেকে ১২৬৯টি এডিসের লার্ভা সংগ্রহ করেন।

পতঙ্গ বিজ্ঞানীদের মতে বেশিরভাগ এডিসের শূককীট পাওয়া যায় নির্মাণাধীন ভবন গুলোর মধ্যে। এবং তার পাশাপাশি যেহেতু করোনা দুর্ভোগের জন্য প্রচুর মানুষ বাড়ি ছেড়েছে সেখানেও পানি জমে এডিসের লার্ভা বিস্তারলাভ হচ্ছে বলে তারা ধারণা করছেন। কিন্তু এটি যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি নির্মূল করা প্রয়োজন।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জুন জুলাই এবং আগস্ট প্রচণ্ড ভয়াবহ ভূমিকা পালন করে। এজন্য সময় থাকতে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত এবং কঠোরভাবে মশা দমন কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত।