ফি‌লি‌স্তিনী‌দের সংগ্রা‌মে ইরান :আবু সা‌লেহ

মাশহাদ, ইরান। ২৯ সে‌প্টেম্বর, ২০২০ ।।
১৯৪৫ সাল, ইরা‌নের তরুণ আলেম সাই‌য়্যেদ মুজতবা নবাব সাফাভী আবাদানসহ ইরা‌নের অন্যান্য এলাকায় ফেদাইয়া‌নে ইসলাম না‌মে একটা সংগঠন গ‌ড়ে তু‌লেন। প্রাথ‌মিকভা‌বে সংগঠন‌টি ইসলাম অবমাননাকারী‌দের প্র‌তি‌রোধ গ‌ড়ে তু‌লে এবং পরবর্তী‌তে বি‌ভিন্ন সামা‌জিক-রাজ‌নৈ‌তিক পদ‌ক্ষেপ গ্রহণ ক‌রে। ১৯৪৮ সা‌লে ইসরাইল প্র‌তি‌ষ্ঠিত হ‌লে ইরা‌নের প্রখ্যাত আলেম আয়াতুল্লাহ কাশানী বি‌ক্ষোভ মি‌ছি‌লের আয়োজন ক‌রেন এবং নবাব সাফাভী ‌সেখা‌নে বক্তব্য প্রদান ক‌রেন। নবাব সাফাভীর বক্ত‌ব্যে সেসময় ৫ হাজার যুবক জ‌ায়‌নিস্ট ইসরাই‌লের বিরু‌দ্ধে জিহা‌দে যাওয়ার জন্য নাম লেখায় কিন্তু রা‌ষ্ট্রের শাষক‌দের বি‌রো‌ধিতার কার‌ণে সেটা অার সেসময় বাস্তবায়ন হয়‌নি।
ফি‌লি‌স্তি‌নী‌দের দুরাবস্থায় বি‌শ্বের বি‌ভিন্ন মুস‌লিম দে‌শের আলেম ও রাজ‌নৈ‌তিক নেতা‌দের ‌নি‌য়ে জর্দা‌নের আম্মা‌নে ফি‌লি‌স্তি‌ন বিষ‌য়ে সেসম‌য়ে স‌ম্মেল‌নের অায়োজন করা হয়। স‌ম্মেল‌নে ইরানী অন্যান্য আলে‌মদের সা‌থে নবাব সাফাভীও অংশ নেন। এর ক‌য়েক বছর প‌রে মিশ‌রে ইখওয়‌ানুল মুস‌লেমীন নবাব সাফাভী‌কে আল-আজহার বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ে মিশর ও ফি‌লি‌স্তি‌নের কয়েকজন শহীদের স্বরণসভায় দাওয়াত ক‌রে। নবাব সাফাভী সেখা‌নে বক্তব্য প্রদান ক‌রেন কিন্তু অনুষ্ঠা‌নের মাঝখা‌নে মিশ‌রের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা‌হিনী অত‌র্কি‌ত বাধা প্রদান ক‌রে এবং নবাব সাফাভী‌কে গ্রেফতার ক‌রে। নবাব সাফাভী ১৯৫৭ সা‌লে মিশ‌রের ইস্কান্দারিয়া বিশ্ববিদ্যাল‌য়ে বক্তব্য প্রদান ক‌রেন। সেসময় তি‌নি ইয়া‌সির অারাফাতসহ বহু ফি‌লি‌স্তি‌নি যুবক‌কে মিশ‌রে দেখ‌তে পে‌য়ে তা‌দের দে‌শে ফি‌রে যে‌য়ে আপন দে‌শের জন্য কিছু করার পরামর্শ দেন।
১৯৫৯ সা‌লে ইয়া‌সির আরাফাত অা‌রোও ক‌য়েকজন সহ‌যো‌গিসহ ফি‌লি‌স্তি‌নি‌দের রাজ‌নৈ‌তিক আন্দোলন ফাতাহ প্র‌তি‌ষ্ঠিত ক‌রেন। ফাতাহ প্র‌তিষ্ঠার পেছ‌নে ইয়া‌সির আরাফাত যে ক‌য়েকজন ব্য‌ক্তির কাছ থে‌কে অনু‌প্রেরণা পে‌য়ে‌ছেন তাদের ম‌া‌ঝে নবাব সাফাভী অন্যতম আর এই ফাতাহ প্র‌তিষ্ঠার পেছ‌নে গুরুত্বপূর্ণ ভূ‌মিকা রা‌খেন জামাল আব্দুন না‌সের। ১৯৫৪ ‌মিশ‌রের সা‌লে ক্ষমতায় অা‌সার প‌রে তি‌নি আরব জাতীয়তাবা‌দের থিউরি দেন।
ইহু‌দিবাদ-ইসরাইল ও সাম্রাজ্যবাদ বি‌রো‌ধি হওয়‌ায় মিশর ছাড়াও সি‌রিয়া, ইরাক, ই‌য়ে‌মেন, অাল‌জে‌রিয়ায় তার বহু ভক্ত-সমর্থক জু‌টে যায়। না‌সের তার সম‌য়ে ১৯৬৭ সা‌লের আরব-ইসরাইল যু‌দ্ধে নেতৃত্ব দেন। ফ‌লে দে‌শে-‌বি‌দে‌শে তার জন‌প্রিয়তা বহুগু‌নে বৃ‌দ্ধি পায়। ১৯৭০ সা‌লে যখন তি‌নি মৃত্যুবরণ ক‌রেন তখন মিশ‌রের মানুষ রাস্তায় গড়াগ‌ড়ি দি‌য়ে কান্না ক‌রে। তার জানাজায় ৫০ লক্ষা‌ধিক মিশরীয় অংশ নি‌য়ে ই‌তিহাস সৃ‌ষ্টি ক‌রে। ইয়া‌সির আরাফ‌াত, বাদশাহ হুসাইনসহ অ‌নেক আরব নেতা জানাজায় কেঁ‌দে ফে‌লেন আর গাদ্দা‌ফি‌তো দু’বার মূর্ছা যান। ‌সেসময় ফি‌লি‌স্তিনীরাও জেরুজা‌লে‌মে শোক মি‌ছিল বের ক‌রে। জামাল আব্দুন নাসের ইসরাইল ও সাম্রাজ্যবাদ বি‌রো‌ধি হ‌লেও মিশ‌রের ইখওয়ানুল মুসলেমী‌নের সা‌থে তার সুসম্পর্ক ছিল না। বহু ইখওয়ান নেতা‌কে তি‌নি জেল-জুলুম দি‌য়ে হত্যা ক‌রেন। ‌
১৯৬৭ সা‌লে ৬ দি‌নের আরব-ইসরাইল যু‌দ্ধে আরবরা পরা‌জিত হ‌লে জামাল আব্দুন না‌সে‌রের মিশর সিনাই উপদ্বীপ হারায়। জামাল আব্দুন না‌সে‌রের মৃত্যুর প‌রে মিশ‌রের ক্ষমতায় আসে তারই ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও উত্তরা‌ধিকারী অা‌নোয়ার সাদাত। ১৯৭৩ সা‌লে সিনাই উপদ্বীপ ফি‌রে পাওয়ার আশায় মিশর আরব-ইসরাইল যুদ্ধে অংশ নেয় কিন্তু এবারও আরবরা পরা‌জিত হয়। ১৯৭৮ সা‌লে বারো দিনের গোপন আলোচনার প‌রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মধ্যস্ততায় আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিম ক্যাম্প ডেভিড চু‌ক্তিতে সাক্ষর ক‌রে এবং মিশর সিনাই উপদ্বীপ ফিরে পায়। একই বছর আনোয়ার সাদাত ও মেনাখেম বেগিমকে শা‌ন্তি‌তে নো‌বেল পুরস্কার দেয়া হয়।
১৯৭৮ সালের সে‌প্টেম্ব‌রে ক্যাম্প ডে‌ভিড চু‌ক্তির মাধ্য‌মে মিশর কর্তৃক ইসরাইলকে স্বীকৃ‌তি দেয়ায় মুস‌লিম বি‌শ্বে হতাশা নে‌মে আসে। ঠিক সেই সম‌য়ে ১৯৭৯ সা‌লে ইরা‌নের আলেম সাই‌য়্যেদ রুহুল্লাহ মুসাভী খোমেইনীর নেতৃ‌ত্বে আমে‌রিকা-ইসরাই‌লের বন্ধু ইরা‌নের রেজা শাহ পাহলাভীর পতন ঘ‌টে। ইমাম খো‌মেইনী ইরানী জনগ‌ণের রা‌য়ের ভি‌ত্তি‌তে ইরান‌কে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হি‌সে‌বে ঘোষণা দেন এবং ইসরাইল-আমে‌রিকার সা‌থে সকল সম্পর্ক ছিন্ন ক‌রেন। ‌তি‌নি রমজা‌নের শেষ শুক্রবারকে ফি‌লি‌স্তিনী‌দের সমর্থ‌নে ‌বিশ্ব আল-কুদস দিবস হি‌সে‌বে পালন কর‌তে নি‌র্দেশনা প্রদান এবং তেহরানস্থ ইসরাইল দূতাবাস‌কে ফি‌লি‌স্তিনী‌দের হাতে তু‌লে দেন। ১৯৬৭ সা‌লে ইসরাইল মিশ‌রের সিনাই এবং সিরিয়ার গোলান মালভূ‌মি দখল ক‌রে নেয়। ক্যাম্প ডে‌ভি‌ডের মাধ্য‌মে মিশর তার সিনাই ফেরত পে‌লেও সি‌রিয়ার হা‌ফিজ আল আসাদ ইসরাইলকে স্বীকৃ‌তি দি‌তে অস্বীকার ক‌রে এবং মিশ‌র ইসরাইল‌কে স্বীকৃ‌তি দেয়ায় মিশর‌কে ত্যাগ ক‌রে ইরা‌নের বিপ্লবী সরকা‌রের সা‌থে সি‌রিয়া সুসম্পর্ক স্থাপন ক‌রে।
পূ‌র্বে ইসরাইল বি‌রো‌ধি আন্দোলন-সংগ্রাম ছি‌ল আরব জাতীয়তাবা‌দের চেতনায় কিন্তু ইরা‌নের ইসলামী বিপ্ল‌বের প‌রে সমগ্র বি‌শ্বের ইসলামী আন্দোলনগু‌লোর ম‌তো ফি‌লি‌স্তি‌নেও প‌রিবর্তন আস‌তে শুরু ক‌রে। ১৯৮১ সা‌লে ফি‌লি‌স্তি‌নে শহীদ ফাতহী শাকাকী ও তাঁর সহ‌যো‌গি‌দের মাধ্য‌মে প্র‌তি‌ষ্ঠিত হয় ইসলা‌মিক জিহাদ, ১৯৮৫ সা‌লে লেবান‌নে হিজবুল্লাহ এবং ১৯৮৭ সালে ফি‌লি‌স্তি‌নে প্র‌তি‌ষ্ঠিত হয় হামাস। ইরান তিন‌টি সংগঠন‌কেই প্র‌তিষ্ঠা-শ‌ক্তিশালী কর‌তে গুরুত্বপূর্ণ ভূ‌মিকা রা‌খে।
‌জায়‌নিস্ট ইসরাইল দিন‌কে দিন ফি‌লি‌স্তি‌নের ভূমি দখল কর‌লেও মিশ‌রের ক্যাম্প ডে‌ভিড চু‌ক্তির প‌রে পাথ‌রের টুক‌রো আর চাকু-অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র দি‌য়ে ইসরাইল‌কে প্র‌তি‌রোধ করা ছাড়া ফি‌লি‌স্তিনী‌দের অন্য কোন পথ খোলা ছিল না। ইরান সি‌রিয়ার হা‌ফিজ আল আসাদ এবং পরবর্তী‌তে তার ছে‌লে বাশার আল আসা‌দের সহ‌যো‌গিতায় ফি‌লি‌স্তিনী-‌লেবাননী‌দের আধু‌নিক অ‌স্ত্র-প্র‌শিক্ষ‌ণে স‌জ্জিত ক‌রে। যার ফলশ্রু‌তি‌তে ২০০০ সা‌লে লেবান‌নে হিজবুল্লাহ তা‌দের দেশ থে‌কে ইসরাই‌লের সৈন্য‌দের বের ক‌রে দি‌তে সক্ষম হয় এবং ২০০৬ সা‌লে ইসরাইল লেবান‌নে হামলা কর‌লে হিজবুল্লাহ তা‌দের ৩৩ দি‌নের যু‌দ্ধে পরা‌জিত ক‌রে। এরপ‌রে ২০০৮ সা‌লে ইসরাইল গাজার হামলা কর‌লে ইসলা‌মিক জিহাদ ও হামাস যৌথভা‌বে ২২ দি‌নে এবং ২০১২ সা‌লে ৮ দি‌নে ইসরাইল‌কে পরাজয় বরণ ও পিছু হঠ‌তে বাধ্য ক‌রে।