সুস্থ থাকতে ভিটামিন-ডি এর প্রয়োজনীয়তা

অনলাইন ডেস্ক ।।

আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ভিটামিন ডি। চোখ, দাঁত ও হাড়ের সমস্যা দূর করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এছাড়া ‘ডি’র মাত্রার সঙ্গে কোভিড-১৯ কেসের একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতো দিন পর্যন্ত সকালের হালকা রোদ থেকে যে পরিমাণ ভিটামিন ডি পাওয়া যেত তা দিয়েই আমরা সুস্থ থাকতাম। কিন্তু মহামারি করোনা আমাদের জানিয়ে দিয়েছে, এই মরণ ভাইরাসকে রুখতে সবচেয়ে কার্যকর ভিটামিন ডি। সকালের মিষ্টি রোদের পাশাপাশি কিছু খাবার থেকেও আমরা এই উপকারি ভিটামিনটি পেতে পারি।

সম্প্রতি হাভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রায় একশ কোটি লোক ভিটামিন ডি এর অভাবে ভুগছে।

ডা. খান আবুল কালাম আজাদ শরীরে ভিটামিন ডি বিষয়ে প্রথমেই বলেন, ‘ভিটামিন ডি শরীরের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শরীরের হাড় ও দাঁত সুস্থ রাখতে যে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মেটাবোলিজম দরকার হয়, সেখানে ভিটামিন ডি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।’

সব মাছেই ভিটামিন ডি বিদ্যমান। বিশেষ করে চর্বিযুক্ত মাছ, যেমন- স্যামন, সার্ডিনস, টুনা, ম্যাককেরেল ইত্যাদিতে ভিটামিন-ডি’র পরিমাণ বেশি। দৈনিক ভিটামিন-ডি চাহিদার ৫০ শতাংশ পূরণ হতে পারে একটি টুনা মাছের স্যান্ডউইচ ।

দেহে ভিটামিন ডি প্রবেশের ক্ষেত্রে খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভিটামিন ডি মূলত আল্ট্রাভায়োলেট রে, অর্থাৎ সূর্যালোকে থাকে এবং চামড়ার ওপরের ভাগ থেকে শরীরে প্রবেশ করে। কোনো কারণে ব্যক্তি সূর্যের আলোর সংস্পর্শে না এলে ভিটামিন ডির অভাব হয়ে থাকে। এর বাইরে জেনেটিক এবং অঙ্গের সমস্যার কারণেও হতে পারে। যেমন লিভার ও কিডনি সুস্থ না থাকলে ভিটামিন ডি ডেফিসিয়েন্সি হতে পারে।

দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভিটামিন ডির প্রভাব সম্পর্কে ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘কোভিড–১৯–এর প্রভাব শুরু হওয়ার পরে ভিটামিন ডি নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুই ধরনের। জন্মগতভাবে এই ক্ষমতা মানুষ নিয়ে আসে। এটি এর মধ্যে একটি। অন্যটি জীবাণুঘটিত রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা। ভিটামিন ডির ঘাটতি থাকলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ইমিউনিটি ভালো হলে কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কম। এ জন্য করোনার সময়ের প্রথম থেকেই চিকিৎসক বয়স্ক এবং অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের লো ডোজ ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। কারণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এর ওপরে নির্ভর করে।’

গবেষণায় জানা যায়, আমাদের দেশে ৮০ শতাংশ মানুষের দেহে ভিটামিন ডির অভাব। এ বিষয়ে তামান্না চৌধুরী বলেন, ‘দৈনন্দিন জীবনে বাইরের থেকে অভ্যন্তরে আমরা সময় বেশি কাটাচ্ছি। সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসছি না। বেলা ১১টা থেকে ১টা সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকলে দেহ পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ডি গ্রহণের সুযোগ পায়। কিন্তু কাজের চাপে অনেকেই সময় পান না। এর বাইরে অনেকেই ইমব্যালেন্স ডায়েট করে থাকেন। এর ফলে কিডনির ওপরে চাপ তৈরি হয়। ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে কার্ব কম এবং প্রোটিন বেশি এই রীতিতে ডায়েট করার কারণে, কিডনিতে চাপ তৈরি হয়। এর ফলে রোগী কিডনির সমস্যায় আক্রান্ত হন এবং দেহ কম ভিটামিন ডি গ্রহণে অভ্যস্ত হয়। এ ছাড়া আর একটি কারণ হচ্ছে অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শের বাইরে নিউট্রিশন গ্রহণ করে থাকেন। যেমন নিজের মতো করে অনেকেই ক্যালসিয়াম গ্রহণ করে। দেহে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি না থাকলে ক্যালসিয়াম শরীরে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

খাবার থেকে মানবদেহ ৩০ শতাংশ ভিটামিন ডি গ্রহণ করে, কিন্তু বর্তমানে ডায়েটসচেতন অনেকেই কোলেস্টরেলসমৃদ্ধ খাবার পুরোপুরি ত্যাগ করেন। কিন্তু সূর্যালোকের সংস্পর্শে চামড়ার নিচের কোলেস্টরেল থেকেই শরীর ভিটামিন ডি গ্রহণ করে থাকে। আর আমাদের দেশের বাজারে স্নেহজাতীয় খাবারের দাম বেশি। তাই ডিমের কুসুম, তেল, ঘি, সামুদ্রিক মাছ থেকে ভিটামিন ডি পাওয়া যায় ।

তামান্না চৌধুরী বলেন, ‘সপ্তাহে তিন দিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকলে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার ইউনিট ভিটামিন ডি দেহ গ্রহণ করে।’

শরীরে ভিটামিন ডির ঘাটতি বুঝতে পারার বিষয়ে অধ্যাপক খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, ভিটামিন ডির অভাব প্রথমেই বোঝা যায় না। আক্রান্ত ব্যক্তিরা দুর্বল হয়ে পড়েন, কাজে আগ্রহ কমে যায়, ক্লান্তি এবং বিষণ্নতা দেখা দেয়, চুল পড়ে যায়, মাংসপেশিতে ব্যথা হয়। বয়স্কদের চামড়ার নিচে কোলেস্টেরল কমে যায়, তাঁরা দ্রুতই ভিটামিন ডির ঘাটতিতে আক্রান্ত হন। আর ত্বকে মেলানিন বেশি থাকলে আল্ট্রা ভায়োলেট ঢুকতে পারে না, এ ক্ষেত্রেও ভিটামিন ডির ঘাটতি হয়। আবার সব সময় দেহ অতিরিক্ত আবৃত থাকলেও ভিটামিন ডি শরীরের সংস্পর্শে আসতে পারে না। এর বাইরে দীর্ঘদিন মৃগী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরেও ভিটামিন ডির অভাব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

খাবারে ভিটামিন ডির উৎস সম্পর্কে খান আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘খাবারের তালিকায় ভিটামিন ডি নিয়মিত রাখতে হবে এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন করে সূর্যালোকের সংস্পর্শে আসতে হবে। দরকারে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’