বাড়ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন, কৌশল বদলাচ্ছে প্রতারকেরা

অনলাইন ডেস্ক ।।

দেশে প্রতিদিনই বাড়ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক,বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণ।একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতারণা,প্রতিদিনই কৌশল বদলাচ্ছে প্রতারকরা।

গ্রাহকদের বোকা বানিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়া প্রতারক চক্র বেশির ভাগ সময় তথ্য নেন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের কাছ থেকে। অর্থাৎ যখন বিকাশ অ্যাকাউন্টে ক্যাশ ইন করা হয় তখন এজেন্টের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তারা কৌশলে গ্রাহকের নম্বরে কল দিয়ে প্রতারণার জাল ফেলে। যারা জালে আটকে যায় তাদের হয় সর্বনাশ। যারা একটু সচেতন তাদের অর্থ খোয়া যায় না। তবে ব্লক অ্যাকাউন্ট খুলতে পড়তে হয় ভোগান্তিতে।

বেসরকারি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। বাসে ওঠার কিছুক্ষণ পরই তার মোবাইলে একটি ফোন আসে। মোবাইলের স্কিনে জিপি লেখা দেখে তিনি ফোনটি ধরেন। অপর প্রান্ত থেকে তাকে বলা হয়, গ্রামীণফোনের সার্ভারে কাজ চলছে, আধা ঘণ্টার জন্য ফোনটি বন্ধ না রাখলে তার হ্যান্ডসেটটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরামর্শ শুনে তিনি মোবাইল সেটটি বন্ধ করে দেন। এর মধ্যে প্রতারক চক্র তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানায়, তিনি অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। দ্রুত অপারেশন করতে হবে। এই মুহূর্তে ২০ হাজার টাকা দরকার। পরিবারের লোকজন তার মোবাইলে বারবার চেষ্টা করেও বন্ধ পান। বাধ্য হয়ে দুটি নম্বরে ২০ হাজার টাকা বিকাশ করে দেন। আধা ঘণ্টা পর ওই কর্মকর্তা ফোনটি চালু করার পর দেখেন মিসকল অ্যালার্টে প্রচুর ফোন এসেছে। দ্রুত তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে ওই বিকাশ নম্বর বন্ধ পান। এটা একটা প্রতারণা, এমন হাজারো -প্রতারণা হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষ প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে। ফলে অর্থ লেনদের জনপ্রিয় এই মাধ্যম চরম আস্থার সংকটে পড়ছে।

২০১০ সালে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১১ সালের ৩১ মার্চ বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিংসেবা চালুর মধ্য দিয়ে দেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের যাত্রা শুরু হয়। এর পরপরই ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিংসেবা চালু করে বিকাশ।

গত বছরের মে মাসের শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বিশ্বে দশম। আর এখন সপ্তম। তখন ৭ কোটি নম্বরে এই ধরনের সার্ভিস চালু ছিল। সচল ছিল ৩ কোটি। বর্তমানে ৯ কোটি ২৯ লাখ ৩৭ হাজার নম্বরে এই ধরনের সার্ভিস চালু রয়েছে। এর মধ্যে ৫ কোটি উপরে সচল আছে। তখন দৈনিক ৯০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতো। এখন দৈনিক গড়ে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো লেনদেন হয়। গত আগস্ট মাসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। বর্তমানে ১৫টি ব্যাংকসহ ১৬টি প্রতিষ্ঠান সেই সেবার সঙ্গে যুক্ত।

গোয়েন্দা পুলিশ মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে প্রতারণার ঘটনাগুলোর তদন্ত করে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ে হাজার রকম প্রতারণা হচ্ছে। প্রতারকরা নতুন নতুন কৌশল বের করছেন। এই চক্রের সঙ্গে শুধু দেশের প্রতারকরাই নয়, বিদেশি প্রতারকদের সন্ধান মিলেছে।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে যে ধরনের অপরাধ হচ্ছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—পকেটমার, গাড়ি গাড়ি গ্রুপ চুরির পর এই মাধ্যমে টাকা নিচ্ছে, হ্যালো পার্টি নামে প্রতারক গ্রুপ, জিনের বাদশা পরিচয় দিয়ে ফোন, জিম্মি করে চাঁদা আদায়, অপহরণের পর চাঁদা দাবি, সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদা, ভুয়া ফ্লেক্সি লোডের নামে টাকা ফেরত, জঙ্গি কার্যক্রমে টাকা লেনদেন, অশ্লীল ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হুমকি দিয়ে টাকা আদায়, ফেসবুক হ্যাক করে টাকা আদায়সহ বহুমাত্রিক প্রতারণা। এসব অপরাধের টাকা মূলত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে।

সর্বশেষ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের সোশ্যাল মিডিয়া ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম শনিবার এই চক্রের ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে। ওয়ালিদ হোসেন বলেন, বিকাশ প্রতারক চক্রের সদস্যরা প্রধানত চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রতারণা কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করে থাকে। প্রথম গ্রুপ মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন বিকাশের দোকানে টাকা বিকাশ করার কথা বলে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে লেনদেনকৃত বিকাশ খাতার ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে দ্বিতীয় গ্রুপের কাছে এলাকা উল্লেখ করে পাঠিয়ে দেয়। এভাবে খুব কৌশলে তারা প্রতারণা করে থাকে। এভাবে হাতিয়ে নেওয়া টাকা বিভিন্ন হাত বদল করে ক্যাশ আউট করে, ফলে প্রতারকদের অবস্থান শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তবে ডাক বিভাগের মোবাইল ব্যাংকিং নগদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে কোনো গ্রাহক যদি নিজের পিন নম্বর কারো সঙ্গে শেয়ার না করেন, তাহলে তাদের প্রযুক্তি ভেঙে প্রতারণা করা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পরিধি বাড়ছে। গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে, সঙ্গে প্রতারণাও। ফলে এখন এ সেবার নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সবার আগে গ্রাহককে সচেতন হতে হবে। নিজের অ্যাকাউন্টের পিন নম্বরটি কাউকে দেয়া যাবে না। তেমনি সেবা দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের সেবার মান বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় প্রতারক চক্র গ্রাহককে হয়রানি করতে বারবার ভুল পিন নম্বর প্রয়োগ করে হিসাব ব্লক করে দেয়। এতে গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েন। এ বিষয়ে বিকাশসহ মোবাইল ব্যাংকিংসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সচেতন হতে হবে। এক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবা দিতে হবে। যেন কোনোভাবেই গ্রাহক ভোগান্তির শিকার না হন।

এছাড়া প্রতারক চক্রের হাত থেকে গ্রাহককে রক্ষা করতে বিভিন্ন মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাপ্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তারা এ বিষয়ে প্রচার করছে। সচেতনতা বাড়াতে এ ধরনের প্রচারণা তারা আরও বাড়াবে বলে প্রত্যাশা করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ মুখপাত্র।