পৃথিবীর সাথে মানুষের যুদ্ধের সংখ্যা বাড়বে, অপেক্ষা করছে ভয়াবহ বিপর্যয়!

নূর মোহাম্মদ :

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমগ্রবিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক অবস্থার যে পরিবর্তন এসেছে তা পৃথিবীর মানুষ সহ অন্যান্য প্রাণীকুলকে জানান দিচ্ছে যে, বসবাসের উপযোগী এই গ্রহটি স্বাভাবিক অবস্থা তথা জীবন ধারণ প্রক্রিয়ার উপাদানগুলো খুব দ্রুত পুরিয়ে আসছে। অপরিকল্পিত প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, বন উজাড়, পাহাড় কেটে জনবসতি স্থাপন, নদী ও জলাধার ভরাট, বালু উত্তোলন, মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরী, শিল্প-কারখানার বিষাক্ত ধৌয়া, বাতাসে রাস্তা-ঘাটের ও শিল্পকারখানার অব্যাহত ধুলো-বালি মিশ্রণ, কীট নাশক ব্যবহার, রাসায়নিক সার ব্যবহার, পারমানবিক ও রাসায়নিক শক্তি প্রদর্শন ইত্যাদি কারণে পৃথিবীর স্বাভাবিক অবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে, যা আমাদের অতি লোভের বর্হিপ্রকাশ।

মানুষ ক্রমশ উন্নত থেকে উন্নততর হতে চায়। তাই সে তৈরী করে মিল-কারখানা, শিল্প। আর এই শিল্পকারখানা থেকে প্রতিনিয়ত নিঃস্বরিত হচ্ছে বিষাক্ত কার্বন। যা আজ পৃথিবীর জন্য হুমকি হয়ে পড়ছে। মিল-কারখানার বিষাক্ত কার্বনের কারণে পৃথিবীর উঞ্চতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বেড়ে চলেছে বন্যা, খরা, ভুমিকম্প, সিডর, আইলা, নার্গিস সহ নানা নামের উপাধি নিয়ে ঝড়-জলোচ্ছাস। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও অনাবৃষ্টি, কোথাও নদীভাঙ্গন, পানির স্তর মাটির গভীরে নেমে যাওয়া সহ ইত্যাদি নানান সমস্যায় ভারাক্রান্ত পৃথিবী নামক এই মনুষ্য বসতি।

মানুষের পাশাপাশি প্রাণীকুলও আজ বিপন্ন হতে চলেছে। ইতিমধ্যে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে হাজারো প্রাণীকুল, যাদের কোন অস্তিত্ব বর্তমান পৃথিবীতে নেই। এই সমস্ত প্রাণীর মধ্যে মানুষের উপকারী প্রাণীর সংখ্যাই বেশী। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছ, বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছ সহ বিভিন্ন পাখ-পাখালি ও পশু।

মানুষ একদিকে তৈরী করছে শিল্পকারখানা, অন্যদিকে তৈরী করছে জনবসতি। মানুষ বৃদ্ধির কারণে জন বসতি সৃষ্টির জন্য পাহাড় কাটছে, ভরাট করছে নদ-নদী। মানচিত্র থেকে ইতিমধ্যে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক খাল, বিল ও নদী-নালা। মানুষের অত্যধিক লোভের শিকার হচ্ছে নিরীহ-শান্ত এই ভূমন্ডলটি। মানুষের অত্যাচারের শিকার হতে হতে আজ পৃথিবীর পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। সে শুরু করেছে বিদ্রোহ। সে আর শান্ত থাকতে যায় না, সে প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে। প্রতিবাদ করছে তার নিজস্ব ভাষায়। তার ভাষা খুবই নির্মম, যাকে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যা বলে থাকি। সে ক্রমশ  অশান্ত হয়ে মানুষকে জানান দিচ্ছে তোমরা আমাকে যুগ যুগ ধরে যেমন খুশি ব্যবহার করেছ কিন্তুু আর আমাকে যেমন খুশি ব্যবহার করা যাবে না। যদি তোমরা আমার প্রতি সদয় না হও তোমাদের জন্য ক্রমান্বয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

জলবায়ু পরিবর্তন প্রায় সকল ক্ষেত্রে এক আগ্রাসী ভূমিকা পালন করছে। জলবায়ু সংশ্লিষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশী বিপদাপন্ন করে তুলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পৌনঃপুনিক বৃদ্ধিসহ দীর্ঘস্থায়ী বন্যা, ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, লবণাক্ততার প্রবেশ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্ছতা বৃদ্ধি ও খরা অন্যতম। যদি এখনই জলবায়ূ পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় কার্যকর গ্রহণ না করে, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক দারিদ্র ও মানুষের খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, জ্বালানী, আশ্রয় ও সামাজিক নিরাপত্তার সমস্যাকে তীব্রতর করবে। আঞ্চলিক বৈষম্য তীব্রতর ও মৌলিক মানবাধিকারগুলো বিনষ্ট হবে।

আমরা নিশ্চই লক্ষ্য করেছি যে, বর্তমানে অতীতের চেয়ে বেশী গরম পড়ছে, কোন কোন বছর বেশী বৃষ্টি হচ্ছে, ঋতুতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, অতিবৃষ্টি হচ্ছে, খরা অথবা অতি বৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হচ্ছে। কোন ঋতুর মাঝে হঠাৎ কোন ঋতু এসে ধরা দেয় বলা মুশলিক হয়ে উঠেছে, যা আগে কখনো এমনি করে সাধারণত হয়নি।

জলবায়ুর এই ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য উন্নতদেশগুলোর পাশাপাশি আমরাও কম দায়ী নই। আজ গ্রামে-গঞ্জে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত মিল-কারখানা ও ইট ভাটা। গ্রামের পর গ্রামে এখন ইট ভাটায় ইট পোড়াচ্ছে। কৃষকদের লোভে ফেলে তাদের ফসলি জমির মাটি কিনে নিচ্ছে মুনাফালোভীরা। প্রাকৃতিক সম্পদ মাটি পুড়িয়ে ইট তেরী ও তা দিয়ে দালান-কোটা তৈরী হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ মাটি কমে যাচ্ছে। নতুন করে আর মাটি তৈরী হচ্ছে না। বিশেষ করে কৃষি জমির উর্বর মাটিগুলো ইট ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে। গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষাকারী সবুজ গাছা-পালাও কিনে নিচ্ছে ভাটা মালিকরা। তা পোড়াচ্ছে ইট ভাটায়। গাছ দিয়ে ইট পোড়ানোর ফলে গাছ-পালা কমে যাচ্ছে অন্যদিকে বিষাক্ত ধৌঁয়া ও ধুলো-বালু বাতাসে মিশে যাচ্ছে। গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। মানুষের শ্বাস-প্রশাস নেওয়ার একমাত্র বায়ু দিন দিন দুষিত হচ্ছে।  এই কারণে মানুষ নানান রকম রোগ-শোকে ভুগছে। যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এই দিকে কেউ নজর দিচ্ছে না।

সমগ্র দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মানুষ যখন দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে বাঁচার চেষ্টা করছে ঠিক তখনই যুক্ত হবে আরেকটি যুদ্ধ। যে যুদ্ধ পৃথিবী নামক গ্রহটির সাথে মানুষের যুদ্ধ। যে আমরা মানুষরাই পৃথিবীর প্রতিপক্ষ। যে পৃথিবী আমাদের আলো দিয়ে, বাতাস দিয়ে, প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে মাতৃ¯েœহে হাজার হাজার বছর ধরে লালন করে আসছে সে কেন আজ আমাদের উপর ক্ষিপ্ত। তা আমাদের বুঝতে হবে। তাকে আমাদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে কোনভাবেই আমরা বাঁচতে পারবো না। সুতরাং এখনই আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আমরাকি পৃথিবী নামক এই গ্রহটিকে মানুষের বসবাস যোগ্য রাখবো?

তাহলে পৃথিবীর সাথে আমাদের আপোষ করতে হবে। তার সাথে নিষ্ঠুর ব্যবহার করা যাবে না। বন উজাড় করা যাবে না, পাহাড় কাটা যাবে না, নদ-নদী ভরাট করা যাবে না, ধৌঁয়া- ধুলোবালি, পারমানবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র দিয়ে বাতাস দুষিত করা যাবে না, নির্বিচারে প্রাণী হত্যা করা যাবে না, সকল ধরনের রাসায়নিক শক্তির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তবে হয়তো পৃথিবী নামক গ্রহের কঠিন যুদ্ধ থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারবো। শত বছর পরেও পৃথিবীর আক্রোশ মুক্ত রাখতে পারবো আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে। শত বছর, হাজার বছর পরেও এই পৃথিবী ভরে থাকুক সভ্যমানুষদের সুন্দর ও নির্মল বাসস্থান হিসাবে। পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষের কাছে এই প্রত্যাশাই রইল। আপোষের কোন বিকল্প নেই। আসুন পৃথিবীর উপর নিষ্ঠুর আচরণ না করে সদয় আচরণ করি। পৃথিবীও আমাদের প্রতি সদয় হবে।

লেখকঃ মানবাধিকার ও উন্নয়নকর্মী,লক্ষ্মীপুর।

ফোনঃ ০১৯১৭৫৭৫৯৯৯