নিরব ঘাতক বায়ুদূষণ

অনলাইন ডেস্ক ।।

বর্তমানে বায়ুদূষণ এক মারাত্মক সমস্যা। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই বায়ুদূষণের ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন এবং দিন দিন এই স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো আরও বেড়েই চলছে। নির্মল ও পরিচ্ছন্ন বায়ু আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য অনিবার্য, সুস্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। তাই বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট (ইপিআইসি) পরিচালিত এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের তথ্য এটি। আর বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদফতরের দায়িত্বপ্রাপ্তরা আশঙ্কা করছেন, আসছে শীতে বায়ুদূষণের মাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়বে। তাদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভয়ঙ্কর গুপ্তঘাতক হয়ে ওঠা বায়ুদূষণে মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

বায়ুদূষণের ফলে স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। ধুলাবালি নাক-মুখ দিয়ে শ্বাসতন্ত্রে আক্রান্ত করে বেশি। প্রথমেই চোখ-নাক আক্রান্ত হওয়ার ফলে চোখ লাল হয়, পানি ঝরে, অ্যালার্জি হয়। নাকে প্রবেশ করে নাক বন্ধ হওয়া, নাকে পানি, অনবরত হাঁচি, নাকে অ্যালার্জি বা রাইনাইটিস, সাইনোসাইটিস এমনকি নাকে রক্তক্ষরণও হতে পারে।

মুখে প্রবেশ করলে টনসিল, ফ্যারিংস, ল্যারিংসে প্রদাহ হয়ে কাশিসহ গলার স্বর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে ক্ষতি হয় শ্বাসনালি ও ফুসফুসে। ফুসফুস আক্রান্তের ফলে সাধারণ কাশি, অ্যাজমা বা হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, এমফাইসিমা, সিওপিডি, নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য ভাইরাল ইনফেকশনের প্রকোপ বাড়তে পারে।

এভাবে দীর্ঘদিন দূষিত বায়ু গ্রহণের প্রভাবে ফুসফুসের ক্যান্সারসহ অন্যান্য রোগ যেমন হৃদরোগ, উচ্চ-রক্তচাপ, মস্তিষ্ক, লিভার ও কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গের রোগ হতে পারে। সবচেয়ে ক্ষতি হয় শিশুদের, তাদের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যাহত হয় এবং স্নায়ুর ক্ষতি হতে পারে। গর্ভবতী মহিলাদের শারীরিক ক্ষতি, গর্ভের সন্তানের জন্মগত ত্রুটি, মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত হয়ে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হওয়ার মতো ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ছাড়া বায়ুতে সিসার পরিমাণ বেশি থাকলে স্নায়ুতন্ত্রের রোগ, পেটের পীড়াসহ রক্তশূন্যতার মতো জটিল রোগের সম্ভাবনা বেশি হতে পারে।

পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যমতে, ঢাকার চারপাশে থাকা ইটভাটাগুলো বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। সাধারণত ইটভাটাগুলো প্রতি বছর শীত মৌসুমে অর্থাৎ নভেম্বর থেকে পুরোদমে চালু হয়। আর এগুলোয় ইট উৎপাদন চলে মে থেকে এপ্রিল পর্যন্ত।

সংস্থাটির গবেষণামতে,  রাজধানীর চারপাশে থাকা ইটভাটাগুলো ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রেই বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘এয়ার ভিজুয়াল’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছর নভেম্বর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এক দিনের হিসাবে বায়ুদূষণের তালিকায় বেশ কয়েকবার ঢাকার নাম এক নম্বরে উঠে আসে।

যদিও বছরের মাঝামাঝি করোনার কারণে এ মাত্রা অনেকটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনযাত্রা শুরুর সঙ্গে আবার বায়ুদূষণের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে চলে যায়। বিশেষ করে রাজধানীতে চলমান মেগা প্রকল্প যেমন- মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিআরটি ও বড় বড় ভবনের নির্মাণকাজ পুরোদমে শুরু হয়ে পড়ায় বায়ুদূষণের মাত্রা আবার বৃদ্ধি পায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতি বছর প্রায় আড়াই হাজার কোটি ইট বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। এর প্রায় ৪০ ভাগ সরকারি নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এ পরিমাণ ইটের বদলে যদি পরিবেশসম্মত ব্লক ব্যবহার করা যায় তাহলে দূষণ অনেকাংশে কমে আসবে। বায়ুদূষণ কমাতে গত বছর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় সরকারের পক্ষে। এতে বলা হয়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মহাসড়ক ছাড়া সরকারি সব নির্মাণকাজে পোড়ানো ইটের বদলে পরিবেশসম্মত ব্লক যা পোড়ানো নয় তা ব্যবহার করতে হবে। এটি বাধ্যতামূলক এবং ধাপে ধাপে ২০২৫ সালে মহাসড়ক ছাড়া সব সরকারি কাজে ব্লক ব্যবহার করতে হবে। ঢাকার বায়ুতে ক্ষুদ্র দূষক পিএম ২.৫-এর মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের আট গুণ এবং জাতীয় মানের চেয়ে ছয় গুণ বেশি। এমনকি সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে বায়ুদূষণের কারণে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও বেড়ে গেছে।

গবেষণামতে, ঢাকার বায়ুদূষণের উল্লেখযোগ্য কারণ ইটভাটা। এ ছাড়া সড়কের ধুলাবালির কারণে ১৮, যানবাহনের কারণে ১০ ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৪ শতাংশ বায়ুদূষণ হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কমে যাচ্ছে। বায়ুদূষণের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ স্টাডির তথ্যে, বাংলাদেশে বায়ুদূষণ ১১ শতাংশ ডায়াবেটিস, ১৬ শতাংশ ফুসফুসের ক্যান্সার, ১৫ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ, ১০ শতাংশ হৃদরোগ ও ৬ শতাংশ স্ট্রোকের জন্য দায়ী।

পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় দূষণের মাত্রা যাতে কিছুটা ভালো থাকে সে জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। দূষণ কমাতে পরিবেশ অধিদফতরের আওতায় বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও করোনার কারণে তা থেমে যায়। অবৈধ ইটভাটাগুলো ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত বছরও প্রায় ৭০০ ইটভাটা ভাঙা হয়। এ বছর আশা করছি আরও বেশিসংখ্যক ইটভাটা বন্ধ করা হবে। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছিল, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি দিয়ে ঢাকার বায়ুদূষণের কারণ চিহ্নিত করা এবং এ উৎসগুলো বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিবেশ সচিবকে সভাপতি করে দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ শীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ অন্যদের কার কী কাজ তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।’

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণকাজের ফলে সৃষ্ট ধুলাবালি যাতে কম হয় তার জন্য চেষ্টা করছি। যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া কমানোর চেষ্টা করব। এমনকি নির্মল বায়ু আইন প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গেছে। আমরা এটি সংসদে পাঠাব। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যেই এ আইন পাস করা হবে। এ আইন প্রয়োগ করতে পারলে বায়ুদূষণ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

পরিবেশ দূষণ এড়ানোর জন্য শুধু সরকার বা কর্তৃপক্ষের দিকে তাকিয়ে থাকলেই চলবে না। নিজেরা আগে পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। রাস্তায় পানি দিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ বা ময়লাগুলো পুড়িয়ে ফেলার মতো নানা ব্যবস্থা নিতে হবে। যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ তো বন্ধ রাখা যাবে না, তাই উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে সঙ্গে আইন মেনে ও যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্ভাব্য দূষণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইটভাটার কার্যক্রম চালানো এবং কল-কারখানাগুলোর বর্জ্য নিষ্কাশনসহ ধোঁয়া কমিয়ে আনার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। কল-কারখানাগুলো শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, এমনকি নতুন কারখানা তৈরির সময় পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা নিতে হবে।

ব্যক্তিগত সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। নিজেদের ঘর-বাড়ি প্রতিদিন ভালোভাবে ধুয়ে মুছে রাখতে হবে, যাতে ধুলা না জমে। আর বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন সুন্দর পরিবেশ আর নির্মল দূষণমুক্ত বায়ু। আমাদের রাস্তাঘাট, কল-কারখানা, বাড়িঘরসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক যেমন প্রয়োজন, তেমনি বায়ুদূষণ প্রতিরোধ করাও জরুরি।