করোনাকালীন শিক্ষা, আমাদের অর্জন ও ভবিষ্যত

স্বপন কুমার দাস ।।
শিক্ষা হল একটি আচরণগত পরিবর্তন। শিক্ষাহল এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে শেখার সুবিধা বা জ্ঞান, দক্ষতা,মান,বিশ্বাস এবং অভ্যাস অর্জন করা যায়।কারও মতে শিক্ষা হচ্ছে বৃদ্ধি ও বিকাশ মূলক জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া।
এ্যারিষ্টটলের মতে-“শিক্ষার্থীদের দেহ ও মনের বিকাশ সাধন তার মাধ্যমে জীবনের মাধুর্য ও সত্য উপলব্ধি করন”।
বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই অর্থনীতি, শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য খাতসহ   প্রতিটি ক্ষেত্রেই শোচনীয় অবস্থা। উন্নত দেশে করোনার যে প্রভাব পড়েছে সেক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর  জন্য এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আর বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়,মহামারী করোনা ভাইরাস যেন নিমিষেই চলমান শিক্ষা খাতের গতিটাকে অনেকটা রুদ্ধ করে দিয়েছে।স্থবির হয়ে পড়ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।চলমান সংকট মোকাবেলায় সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
গত বছর ৭ এপ্রিল থেকে সংসদ টেলিভিশনেে প্রাথমিক ক্লাস সম্প্রচারিত হচ্ছে। তবে এটি শতভাগ শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাতে পারেনি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায় সংসদ টেলিভিশনে ক্লাস প্রচার ৫৯-৫২ শতাংশ শিক্ষার্থীর কাছে পাঠ পৌছানো সম্ভব হয়েছে।আর মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের অনলাইনে ক্লাস শুরু হয় ২৯ শে মার্চ থেকে।তবে ইন্টারনেট সমস্যা, ডিভাইসের অপর্যাপ্ততা,শিক্ষকদের প্রশিক্ষনের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে অল্প কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করে অনলাইন ক্লাস পরে এর বিস্তার ঘটে।
গত বছর বাংলাদেশ টেলিভিশনেে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য রুটিন মাফিক ক্লাস শুরু করে যা কিছুটা হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয় পাশাপাশি অনলাইন ক্লাসও তারা করেছে।এতে কিছুটা হলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে গতি এসেছে। তবে অনেক শিক্ষার্থীই নেটওয়ার্ক সমস্যা অথবা নেটওয়ার্কের আওতায় না থাকায় বঞ্চিত হয়েছে। বাংলাদেশে করোনাকালীন সময়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায় সংযোজন হলো তার নাম অনলাইন ক্লাস। দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শ্রেনি কক্ষে গিয়ে অধ্যয়ন করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশনা চালু রাখতে পারে তার বিকল্প হিসেবে অনলাইনে ক্লাস।যা বিশ্বব্যাপী আজ সমাদৃত।
শ্রেনিকক্ষে যেমন শিক্ষক এবং   শিক্ষার্থীরা একে অপরকে দেখতে পায়,ঠিক তেমনই জুম,গুগল ক্লাসরুম,ওয়েবএক্স বা এ জাতীয় ভিডিও কনফারেন্সিং সফটওয়্যার এর মাধ্যমে শিক্ষক ইন্টারনেটের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের দেখতে পান এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষককে। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে ইন্টারনেট অপরিহার্য হয়ে উঠেছে যা ছাড়া বর্তমান শিক্ষা ক্ষেত্র বিকল।এই মহামারীর সময়ে শিক্ষাকে সচল রাখতে ইন্টারনেটের গুরুত্ব অপরিসীম।
তথ্য ও প্রযুক্তিতে দক্ষতানির্ভর শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।অনলাইননির্ভর শিক্ষার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সহজে কোন কিছু সংরক্ষণ। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক তাঁর লেকচার অনলাইন ক্যামেরা দিয়ে রেকর্ড করতে পারেন। এখন তাঁরা রেকর্ডসমুহ পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন,পিডিএফ, স্লাইডশেয়ার কিংবা ইউটিউব লিংকের মাধ্যমে সেগুলোকে ইন্টারনেটে সংরক্ষণ করতে পারছেন। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সময় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারছে।
করোনাকালীন সময়ে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম আমাদের জন্য একটা অর্জন যা করোনা পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। তবে রিমোট এরিয়া যেমন-পাহাড়িএলাকা,হাওরএলাকা,চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের বিশেষ আওয়তায় নিয়ে আসতে হবে।  তাদের জন্য বাংলাদেশ বেতারে প্রচারের ব্যবস্থা, মুঠোফোন ব্যবহার করে হটলাইন ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদেরকে বাড়ি বাড়ি যেয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা প্রদান করার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা মহামারীকালীন ও মহামারী পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে অতিদ্রুত যুক্ত হতে পারে।পাশাপাশি ভবিষ্যৎ শিক্ষা ব্যবস্থা  নিয়েও আমাদের এখনই ভাবা উচিত করোনা মহামারীর বিপর্যয় এক সময় কেটে যাবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবার মুখরিত হয়ে উঠবে শিক্ষার্থীদের কল কাকলিতে, প্রানের সঞ্চার পাবে প্রতিটি ক্যাম্পাস। অনলাইন শিক্ষা আজ বিশ্ব সমাদৃত সেদিকে লক্ষ রেখে শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।আইসিটিতে শিক্ষকদের দক্ষ করে তুলতে হবে। অনলাইন ভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতির প্রচলন করে প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন কল্পে সরকার ও দেশের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদের কাজ করতে হবে। শিক্ষকদেরকে অনলাইনে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করতে হবে।শিক্ষায় করোনা অভিশাপ না হয়ে অনুঘটক হিসেবে বিশ্বায়নের যুগে অনলাইন শিক্ষা প্রতিযোগীতায় আশীর্বাদ হিসেবে পেতে হবে এদেশকে।
বিশ্বায়নের যুগে শিক্ষাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বানিজ্যিকায়ন করেছে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশও নিশ্চয়ই পিছিয়ে থাকবে না।যেমন আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিপূর্ণ অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতি গ্রহনের কারনে পার্শবর্তী দেশ ভারতের প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী আমেরিকার নামি দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ভর্তি হয়েছেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সেটা অনুধাবন করতে পেরেছে যে অনলাইন শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। এজন্য আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে অনেক সিনিয়র শিক্ষক মানসিকভাবে অনলাইন শিক্ষায় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তাদেরকে অনলাইন শিক্ষায় প্রশিক্ষনের মাধ্যমে পারদর্শী করে তুলতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব বলেন, “শিক্ষক হলেন শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার প্রান, সময়ের সাথে সাথে  তাদের কাজের পরিধি বেড়েছে। বেড়েছে    চ্যালেঞ্জও। বর্তমান সমস্যা মোকাবেলা করে আগামীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য দক্ষ, আধুনিক ও সময়োপযোগী শিক্ষক তৈরি দরকার। ডিজিটাল রিসোর্স তৈরি করার জন্য  এবং এডুকেশন টুলস ব্যবহার করার জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষকের বিকল্প নেই”। ই শিক্ষাখাতে বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে যেন কোন অসুবিধার সম্মুক্ষীন হতে না হয়।   যে কোন মহামারী সময় আমরা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারি।
লেখকঃ স্বপন কুমার দাস