করোনায় দেখা দিতে পারে স্নায়ুর নানাবিধ সমস্যা,গবেষনা ডাক্তারদের

অনলাইন ডেস্ক ।।

করোনা ভাইরাস প্রতিনিয়ত তার রূপ পরিবর্তন করছে। ফলে উপসর্গও পরিবর্তিত হচ্ছে। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের নানা ধরনের স্নায়বিক রোগে ভুগতে দেখেছেন চিকিৎসকরা।

এ ধরনের স্নায়বিক রোগীরা প্রচলিত চিকিৎসায় সেরে উঠছেন না। এ প্রেক্ষিতে তাদের পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ রোগীই করোনায় আক্রান্ত।

করোনাকালে স্নায়বিক সমস্যা হলে সেটি কী স্বতন্ত্রভাবে স্নায়ুতন্ত্রেরই কোনো সমস্যা, নাকি করোনার উপসর্গ হিসেবে দেখা দিয়েছে, তা নির্ধারণ করা জরুরি। এটি নির্ধারণের জন্য রোগীর ইতিহাস সঠিকভাবে জানাতে হবে চিকিৎসককে। আর এটি কেবল রোগীর নিজেরই দায়িত্ব নয়, বরং নিজের সমস্যা বর্ণনা করতে রোগীর অপারগতায় পরিবারের লোকজন বা তাঁর দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিত লোকজনকেও সঠিকভাবে রোগীর তথ্য ও রোগের ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে হয়। অনেক বয়স্ক মানুষেরই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। তাঁদের করোনার লক্ষণ থাকলে সেটিও ভুলে যেতে পারেন। এমন ব্যক্তির কাছে যাঁরা থাকেন, তাঁদের একটু বাড়তি মনোযোগের প্রয়োজন। তাঁরা যদি ওই ব্যক্তির ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়া, কোনো ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ, জ্ঞানের মাত্রা কমে যাওয়া, জ্বর কিংবা করোনার অন্য কোনো উপসর্গ লক্ষ করে থাকেন, তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালে আসা স্নায়বিক রোগীদের বেশির ভাগই চিকিৎসায় সুস্থ হচ্ছেন না। যদিও তাদের মধ্যে করোনার কোনো উপসর্গ নেই। পরে চিকিৎসকরা পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখেন যে, তারা করোনায় আক্রান্ত।

সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে এমনটা দেখা গেছে। যা চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা গবেষণা শুরু করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নিউরো ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যোগাযোগও করা হচ্ছে।

কখনো উপসর্গ ছাড়াই করোনা ভাইরাস পাওয়া যাচ্ছে মানুষের শরীরে। কখনো ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন শেষ হওয়ার পরও শরীরে করোনার সন্ধান মিলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি, শুকনো কাশি ও শ্বাসকষ্টকে শুরুতে কোভিড-১৯-এর লক্ষণ বা উপসর্গ বলে ধরে নেওয়া হলেও যতই দিন যাচ্ছে করোনার নতুন নতুন উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। কাঁপুনি, পেশিতে যন্ত্রণা, মাথাব্যথা, কিছুতে স্বাদ না পাওয়া এবং কোনো কিছুতে গন্ধ না পাওয়ার মতো লক্ষণ যোগ হচ্ছে করোনা ভাইরাসের উপসর্গের তালিকাতে।

চিকিৎসক মোহাম্মদ সেলিম শাহী জানালেন, করোনা রোগীর যেমন মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, স্বাভাবিক ঘ্রাণশক্তি চলে যাওয়া, স্বাভাবিক স্বাদ চলে যাওয়া, হাত-পায়ের পেশির দুর্বলতা ও এসব পেশিতে ব্যথার মতো সমস্যা হতে পারে, তেমনি রোগীর জ্ঞানের মাত্রা কমে যাওয়া কিংবা পক্ষাঘাতের মতো বড় ধরনের সমস্যাও হতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এ ধরনের সমস্যা করোনার কারণেও হতে পারে, আবার করোনার সংক্রমণ না হলেও হতে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর পক্ষাঘাতের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর করোনা ধরা পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে এ রকম মনে করার সুযোগ নেই যে পক্ষাঘাতের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে করোনা সংক্রমণ হয়েছে। কারণ করোনা সংক্রমণের কারণেই হতে পারে পক্ষাঘাত।

করোনায় সর্বশেষ যোগ হওয়া স্নায়বিক রোগসমূহ :

স্ট্রোক: মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে ঐ অংশের কোষগুলো নষ্ট হওয়াকে স্ট্রোক বলা হয়। আগে স্ট্রোকের রোগীদের চিকিৎসা দিলে ভালো হয়ে যেতেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক স্ট্রোকের রোগী চিকিৎসায় ভালো হচ্ছেন না। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে চিকিৎসকরা দেখতে পান যে, করোনার উপসর্গ হিসেবে তার স্ট্রোক হয়েছে। এ কারণে আগের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি স্ট্রোকের রোগী মারা যাচ্ছেন।

জিবিএস: এটি একটি ভয়ানক রোগ। অনেক সময় কোনো লক্ষণই নেই, হঠাৎ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা যায়, হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে। প্রথমে দুই পা নাড়াতে পারছেন না। আস্তে আস্তে হাতও নাড়াতে পারছেন না। ক্রমান্বয়ে হাত ও পায়ের শক্তি কমে যায়। চিকিৎসায় এই রোগ ভালো হয়ে যায়। তবে বর্তমানে জিবিএস রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিয়েও ভালো করা যাচ্ছে না। রোগীর নাকে ও জিহ্বায় স্বাদ থাকছে না। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ঐ রোগী করোনায় আক্রান্ত। অর্থাৎ করোনার কারণে জিবিএস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে লোকজন।

মুখ বাঁকা: সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ লক্ষ করলেন, মুখের এক পাশ বাঁকা হয়ে গেছে। খেতে গেলে মুখের এক পাশ দিয়ে পানি পড়ে যায়, এক পাশের চোখ বন্ধ হয় না। এ রকম পরিস্থিতিতে সবাই ধারণা করেন, রোগীর নিশ্চয়ই ‘স্ট্রোক’ হয়েছে। এটি স্নায়ুগত সমস্যা ঠিকই, তবে তা স্ট্রোক নয়। এই রোগের নাম ‘বেলস পালসি’। এটি মুখ বাঁকা রোগ নামেও পরিচিত। এই রোগ হলে আগে যে চিকিৎসা দেওয়া হতো, এখন সেই চিকিৎসায় কাজ হচ্ছে না। অর্থাৎ রোগী করোনায় আক্রান্ত, যার করোনার কারণে এই মুখ বাঁকা রোগ হয়েছে। এ ধরনের রোগী এখন প্রচুর পাওয়া যাচ্ছে।

এনকেফেলাইটিস:এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ যার সংক্রমণ মানুষ ও অন্যান্য পশুর মধ্যে ঘটে থাকে। খিঁচুনি, জ্বর ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এই রোগের লক্ষণ। ভাইরাসসহ বিভিন্ন কারণে এই রোগ হয়। এতে মৃত্যুর হার বেশি। বর্তমানে এনকেফেলাইটিস অনেক রোগী আসছে, যাদের চিকিৎসায় কোনো কাজ হচ্ছে না। এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের পরীক্ষা করে দেখা গেছে, অধিকাংশই করোনায় আক্রান্ত। অর্থাৎ করোনার কারণে তার এ রোগ হয়েছে।

নিউরোপ্যাথি: এই রোগে আক্রান্ত রোগীর নার্ভ কাজ করে না। নার্ভ দুর্বল হয়ে যায়। শক্তি পায় না। ডায়াবেটিস কিংবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এই রোগ হতে পারে। আগে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধে এ রোগ ভালো হয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে নিউরোপ্যাথি আক্রান্ত অধিকাংশ রোগী চিকিৎসায় ভালো হচ্ছেন না। এছাড়া করোনায় আক্রান্ত অনেক রোগী স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলছেন। যদিও তাদের শরীরে করোনার কোনো উপসর্গ নেই। অবশ্য সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করার পর দেখা যাচ্ছে, তারা করোনায় আক্রান্ত। দুই পা অবশ হয়ে যাওয়া, প্রশ্রাব-পায়খানা বন্ধ হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ প্যারালাইসিস। তাদের শরীরে করোনার লক্ষণও ছিল না। এ জাতীয় রোগীর সুস্থতার হার খুবই কম। যেসব কারণে এ রোগ হয়, বর্তমানে সেসব কারণও পরীক্ষায় পাওয়া যায়নি। এ কারণে ওষুধেও কাজ হচ্ছে না। এন্ট্রি ভাইরাল ওষুধ দিয়েও কাজ হচ্ছে না।

ব্রেনে রক্ত জমাট বাঁধা: স্ট্রোকের কারণে আগে এমনটা হতো। এখন কোভিডের কারণে ব্রেনে রক্ত জমাট বাঁধে। অর্থাৎ করোনা ভাইরাসের উপসর্গগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ব্রেনে রক্ত জমাট বাঁধা।

ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্স: শরীরে সোডিয়াম ও পটাশিয়াম কমে যাওয়াকে বলা হয় ইলেক্ট্রোলাইট ইমব্যালেন্স। ইদানীং দেখা যায় মাথাব্যথা, মাথা ঘুরানো ও খিঁচুনির মতো উপসর্গ নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে আসেন। তাদের শরীরে করোনার লক্ষণ নেই। পরীক্ষায় দেখা যায়, এসব সিংহভাগই করোনায় আক্রান্ত। চিকিৎসকদের মতে, করোনার কারণে তাদের এ সমস্যা।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালের পরিচালক প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. কাজী দীন মোহাম্মদ ও যুগ্মপরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, স্নায়বিক রোগসমূহ করোনার অন্যতম উপসর্গ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বর্তমানে নিউরোলজিক্যাল যেসব রোগে আক্রান্ত হয়ে রোগীরা আসছেন তাদের বেশির ভাগই করোনায় আক্রান্ত। এটি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। ওষুধেও কাজ হচ্ছে না। এ ব্যাপারে গবেষণা চলছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত নিউরোলজিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, করোনায় যারা আক্রান্ত হচ্ছে তাদের মধ্যে ৮৫ শতাংশের ক্ষেত্রেই স্নায়বিক রোগে ভোগার আশঙ্কা বেশি। প্রাথমিক উপসর্গহীন অবস্থা থেকে মৃদু ও মাঝারি সংক্রমণে যারা দীর্ঘ দিন ভুগে চলেছে, সেই সমস্ত কোভিড রোগীদের ক্ষেত্রেই স্নায়বিক রোগে ভোগার আশঙ্কা বেশি। ঘনঘন মাথাব্যথা, ব্রেন ফগ বা চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলার মতো স্নায়বিক রোগ হতে পারে। এর পাশাপাশি স্বাদ ও ঘ্রাণশক্তিও তারা হারিয়ে ফেলতে পারেন। অর্থাৎ চার রকমের স্নায়বিক রোগে ভুগতে হতে পারে কোভিড রোগীরা। এমনকি গবেষণা থেকে এও জানা গিয়েছে, যাদের চিকিৎসার জন্য যাদের কখনও হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়নি, তারাও ভুগতে হতে পারে এই সব স্নায়বিক রোগে।

আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকা অ্যানালস্‌ অব ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ট্রান্সলেশনাল নিউরোলজি-তে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এই খবর পাওয়া গিয়েছে। গত ২৩ মার্চ এই গবেষণা পত্রটি প্রকাশ করা হয়। গবেষণার জন্য, প্রাথমিক উপসর্গহীন অবস্থা থেকে মৃদু ও মাঝারি সংক্রমণে দীর্ঘ দিন ভুগেছে আমেরিকায় এমন ২১টি জায়গার ১০০ জন রোগীদের নিয়ে এই গবেষণা করা হয়।

গবেষণাপত্র থেকে জানা গিয়েছে, ১০০ জন কোভিড রোগীর ৮৫ শতাংশের মধ্যেই চার ধরনের স্নায়বিক রোগের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে ব্রেন ফগ। অর্থাৎ চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। কোভিড রোগীদের ৮১ শতাংশের মধ্যেই এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা গিয়েছে। এ ছাড়া ঘনঘন মাথাব্যথায় সমস্যা দেখা গিয়েছে ৬৮ শতাংশ কোভিড রোগীদের মধ্যে। কথা জড়িয়ে যাওয়া বা কথা না বলতে পারার মতো রোগে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৬০ শতাংশ রোগী। স্বাদ ও ঘ্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন ৫০ জনেরও বেশি রোগী। ঝিমভাব দেখা গিয়েছে ৪৭ শতাংশ রোগীর। দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গিয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশের।