সৌদি- ইরান সম্পর্ক আসলে কি সম্ভব

শেখ আল মামুন, সাতক্ষীরা ।।
সৌদি চাইলেও সৌদি-ইরান সম্পর্ক হওয়ার কোন সুযোগ দেখছি না। তবে আলোচনায় আগ্রহ ও পরষ্পরের গত মাসে বাগদাদে আলোচনার টেবিলে বসা হয়তো তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বরফ গলাতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে সামরিক সহযোগিতা দিতে পারার মত কোন বন্ধু দেশ নেই, এলায়েন্স নেই। তাই বিকল্প হিসেবে সিরিয়া,ইরাক,লেবানন,ইয়েমেন সরকারের সাথে সম্পর্ক করে প্রক্সি যোদ্ধাদের দিয়ে পশ্চিমা স্বার্থকে ব্যস্ত রেখে নিজ ভূখন্ডকে নিরাপদে রেখেছে ইরান। এরপরেও জায়নিস্ট ইন্টেলিজেন্সের হাতে বহু ইরানি ইঞ্জিনিয়ার,ডাক্তার,রাজনীতিক,গবেষক,ব্যবসায়ী শহীদ হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রক্সিযোদ্ধারা সক্রিয় না থাকলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষনা ও চর্চা করার সুযোগই হয়তো পেতো না ইরান। উত্তর কোরিয়ার মত একঘরে হয়ে থাকতে হতো। নিষেধাজ্ঞার ভেতরে থেকেও প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্মানে যোগাযোগ চালাচ্ছে বিভিন্ন শর্ত মেনে নিয়ে। এরপরও ইরানের সাথে ছয় জাতির করা চুক্তি ভঙ্গ করেছে আমেরিকা।
সর্বশেষ ইরান- চীন পঁচিশ বছর মেয়াদী চুক্তির পরে আন্তর্জাতিক অঙ্গন বিশেষ করে পশ্চিমা মিডিয়া চুক্তি নিয়ে নানান রকমের চুল চেরা বিশ্লেষণ করেছেন, করছেন। হামাসের কাছে ইজরায়েলের পরাজয়ের পরে হামাস নেতার ইরানকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন পরিষ্কার করেছে ইরানের নেটওয়ার্ক কতদুরে কতটা গভীরে বিস্তৃত।
এর আগে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত, পারস্য সাগরে ইউএস নেভি সীলের সোলজারদের গ্রেফতার করে হ্যান্ডকাফ লাগানো ভিডিও সারা দুনিয়া দেখেছে। ঘোষনা দিয়ে ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে মার্কিন সমরাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা চুলচেঁরা বিশ্লেষণ করেছেন এবং হামলার ভয়াবহতাও বর্ণনা করেছেন।
ইয়েমেনের উপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে ইরানের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে হুতিরা সৌদির ভেতরে আক্রমন করছে। বাইডেন সরকার এই যুদ্ধের নিশ্চিত নিষ্ফল অথবা পরাজয় আঁচ করতে পেরে যুদ্ধ থেকে সরে আসার ঘোষনা দিয়েছে।
সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের সাথে রাশিয়ার মৈত্রি নির্মান করেছে ইরান। রাশিয়া আর ইরান পাশে থাকায় মার্কিনপন্থী সমগ্র শক্তি একত্রিত হয়েও আসাদকে সাদ্দাম অথবা গাদ্দাফীর মত ছুড়ে ফেলে দিতে পারেনি। এসব কিছু বিবেচনায় সৌদি আরবের ইরানের সাথে বিরোধের চেয়ে মৈত্রীই উত্তম মনে হওয়া স্বাভাবিক। ইরান যদি একঘরে থাকতো এবং চীন,রাশিয়ার সাথে কৌশলগত সম্পর্ক না থাকতো তাহলে চুক্তির বিষয়টি সৌদির পরিকল্পনায় হয়তো আসতো ই না। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার উপস্থিতি ঘটেছে ইরানের পরিকল্পনায়। আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রয়োজনমত যাদের তৈরি করেছে প্রয়োজন শেষে তাদেরকেই ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। অতএব মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সাবেক বিশ্বাসযোগ্যতার গ্রহনযোগ্যতা বর্তমানে আগের মত নেই। ইরান চায় আমেরিকার বিকল্প কারো হাত ধরে নতুন গ্লোবার অর্ডার নির্মান করতে এবং এখন পর্যন্ত পরিকল্পনা মত এগিয়ে যাচ্ছে। সেটা কতদুর নিতে পারবে তার জন্য বৈশ্বিক পরিবর্তন ও নয়া চ্যালেঞ্জের ধরন ও সমাধানের প্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখা জরুরী।
সবকিছু বিবেচনায় মার্কিন প্রেসক্রিপশনে সৌদি যুবরাজ বিন সালমান ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন চায়। তবে সেই উন্নয়নে সৌদির শর্ত থাকবে “মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিরসনে” শব্দটি ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি যোদ্ধাদের নিষ্ক্রিয় করা, ক্ষেপনাস্ত্রের আধুনিকায়ন নিয়ে গবেষনা কমিয়ে আনা, পরমানু গবেষনা কমানো, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে বিরত থাকা। সেগুলো কি ইরান মানবে!  মোটেই না। ইরান সাদ্দাম হোসেন আর মুয়াম্মার গাদ্দাফীর পরিনতি দেখেছে।
তবে ইরান চাইবে দীর্ঘ মেয়াদে নানান ইস্যু নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে এবং আলোচনা চলাকালীন ফায়দা নিতে। উভয়েই উভয়ের অবস্থান ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন।  উল্লেখিত শর্ত ও শর্তের সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়ের বাইরে যদি কোন শর্ত থাকে সেটা হয়তো ইরান মেনেও নেবে। সেটাই হোক। তাই যদি হতে হয় তাহলে পরিষ্কারভাবে সৌদিকে মার্কিন ব্লক থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবে সেটা কি সম্ভব!
কৌশলগত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অসম্ভব বলেও কিছু নেই। সৌদি আরব চার্চিলের বৃটেনের বলয় থেকে বেরিয়ে  রুজভেল্টের হাতে যখন স্বেচ্ছায় সোপর্দ হতে পেরেছে তখন রেজিম টিকিয়ে রাখতে চীন, রাশিয়ার বলয়ে ঢুকতে ইরানের করিডোর দিয়ে সে ঢুকতেই পারে।