লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের অসৎ কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যে অসহায় পাসপোর্ট প্রত্যাশীরা

মিজানুর রহমান,লালমনিরহাট:
লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অসৎ কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যে পাসপোর্ট প্রত্যাশীরা অসহায়।পাসপোর্ট আবেদনকারী দের কাছ থেকে কৌশলে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বাড়তি টাকা।টাকা না দিলেই আবেদন ফরমে ভুল আছে দাবী করে হয়রানি করা হচ্ছে পাসপোর্ট আবেদন কারীদের।লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কিছু অসৎ কর্মচারীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করেছেন পাসপোর্ট প্রত্যাসী ভুক্তভুগীরা।
বিদেশ গামী মানুষের হয়রানি বন্ধ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সতর্কবার্তা দেবার পরেও টনক নড়েনি লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের।লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সরেজমিনে গিয়ে উঠে আসে পাসপোর্ট প্রত্যাশী দের উপর হয়রানির এমন চিত্র।
টাকার বিনিময়ে রাত কে দিন করা হচ্ছে তথ্যে ভূল থাকার পরেও অর্থের বিনিময়ে অসৎ কর্মচারীরা সেটি নিজেরাই সংশোধন করে চালিয়ে দিচ্ছেন,যাদের নির্ভূল আবেদন রয়েছে তাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে বাড়তি চাপ দিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের সাথে অসাদআচরন করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
বিদেশে কর্মসংস্থান ও চিকিৎসার জন্য মানুষ দ্রুত পাসপোর্ট পেতে জরুরি পাসপোর্ট ফি প্রদান করার পরেও সময় মতো পাসপোর্ট না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা গুনে দিচ্ছেন অসৎ কর্মচারীদের হাতে।
লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে একটি চক্র গড়ে উঠেছে যারা সাধারন মানুষের কাছ থেকে অসৎ উপায়ে লক্ষ লক্ষ টাকা প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছেন,এদের মধ্যে পরিছন্ন কর্মী বাবুল মিয়া,ওমর আলী,আনোয়ার এর দাপট সর্বত্র।বাবুল, ওমর আলী, আনোয়ার হোসেন পাসপোর্ট অফিস নিয়ন্ত্রন করে ঘুষ বানিজ্যর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।২০১৩ সাল থেকে একই অফিসে থাকায় একক ভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে বাবুল মিয়া।একই অফিসে দীর্ঘ ০৯ বছর চাকরি করেও রহস্যজনক কারণে বদলি হয়নি বাবুল মিয়ার।
অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন করার পর অফিসে কাগজ জমা দিতে গিয়ে সেবা প্রত্যাশীদের বিড়ম্বনা শুরু হয়।অথচ প্রতিটি অনলাইন আবেদন করতে পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের গুনতে হয় ৩০০টাকা।নানা ভুল ধরে শুরু হয় দর কষাকষি।
ইতিপূর্বে পাসপোর্ট অফিসের অফিস সহায়ক আনোয়ার হোসেন পাসপোর্ট প্রদানের সময় হারুন-অর-রশিদ নামে এক ছাত্রের কাছে ১৫শত টাকা দাবী করেন।বিষয়টি নিয়ে একটি ভিডিও মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়।
আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের দুবাই প্রবাসী রাশেদা বেগম(৪০) জানান, আমার পাসপোর্ট বই হারিয়ে গেছে। থানায় ডায়েরি করে অফিসে আসছি। আসার পর অফিসের দুই একজনের সাথে কথা বলি, এরমধ্যে বাবুল নামের এক ব্যক্তি এসে টাকা চাইলো এক হাজার। টাকা দিতে পারলে দ্রুত কাজ হয়ে যাবে। টাকা না দেওয়ায় আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে এবং অফিস থেকে বের করে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন,আমরা বিদেশে ইনকাম করে দেশে টাকা পাঠাই। আমাদের সাথে এমন করার কারণ বুঝি না। অফিসটা দূর্নীতিতে ভরে গেছে।
অনলাইনে আবেদনের পর কাগজ জমা দিতে আসা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহিলা) জানান,গত বৃহস্পতিবার থেকে ঘুরছি। জমা নিচ্ছে না। সকালে বলে দুপুর ১ টায় আসেন দুপুরে আসলে বলে স্যার নাই।
তিনি আরও বলেন,রোববার(২০ ফেব্রুয়ারী) অফিসে ভিতর উত্তর পাশে রুমে বসে থাকা এক ফর্সা করে কর্মচারীকে বাড়তি এক হাজার টাকা দিলাম সাথে সাথেই আবেদনটি আমার জমা নিল।
হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতার সাজু মিয়া জানান, মায়ের চিকিৎসার জন্য ভারতের নিয়ে যাব তাই দ্রুত পাসপোর্ট প্রয়োজন অনলাইনে আবেদন করছি ঠিকই কিন্তু বাবা নামের জায়গায় মোহাম্মদ বসে গেছে এই ভুলটির জন্য পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারীরা আবেদন ফরম ফি জমা দিচ্ছেন না। পরে একহাজার টাকার বিনিময় ওই আবেদনটি জমা নেন।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোঃ হারুন অর রশিদ জানান, আমার চাচা সিঙ্গাপুরে থাকে তাই আমাকে পাসপোর্ট করে দ্রুত ওই দেশে যেতে হবেই কর্মসংস্থানের জন্য। তাই আমি লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের আবেদন জমা দিয়েছি আমার পাসপোর্টে চলে এসেছে। অফিসে পাসপোর্ট নিতে গেলে অফিস কর্মচারী আনোয়ার হোসেন আমার কাছে মিষ্টি খাওয়ার জন্য ১৫ শত টাকা দাবি করে। টাকা না দিতে পারায় তাকে পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে না। পরে আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগে আমি লাইভ প্রকাশ করি।
জানা গেছে, লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের পরিচ্ছন্ন কর্মী বাবুল মিয়া ও অফিস সহায়ক আনোয়ার হোসেন,ওমর আলীর দাপটে চলে পুরো পাসপোর্ট অফিস।অফিসের বেশির ভাগ কর্মকর্তা- কর্মচারী টাকা ছাড়া পাসপোর্টের আবেদন জমা নেন না। কমপক্ষে এক হাজার ৫০০ টাকা দিলে এক দিনেই আবেদনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে দেন তাঁরা। টাকা দিতে না পারা অনেক গ্রাহকদের দুর্ব্যবহার করে অফিস থেকে বেরও করে দেন তারা। গ্রাহকদের আবেদনে নানা ধরনের ভুলত্রুটি ধরে দিনের পর দিন হয়রানি করা হয়। পরে শেষে বাধ্য হয়ে একসময় হার মানে এবং দেড় হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে পাসপোর্ট করায়।
লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কর্মচারী আনোয়ার হোসেন ও অফিসের পরিচ্ছন্ন কর্মী বাবুল মিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমরা পাসপোর্ট দেওয়া-নেওয়া আবেদন জমার বিষয়ে কোন টাকা পয়সা নেই না। অফিস থাকলে এমন হবেই। পারলে আমাদের নামের রিপোর্ট করেন।
লালমনিরহাট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারি পরিচালক বজলুর রশিদ জানান, ওই দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
