দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা সাধারণ মানুষ

অনলাইন ডেস্ক।।

‘সবজি বাজারে যখন আসি তখন মনে হয়, না আসলেই ভালো ছিল। সবকিছু ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। আগে এক কেজি কিনতাম, এখন তার অর্ধেক পরিমাণও কিনতে কষ্ট হয়।’ 

দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধিতে এভাবেই নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন আলামিন নামে এক রিকশাচালক। একইভাবে দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা।

এদিকে দাম বাড়ার কারণ হিসেবে খুচরা ব্যবসায়ীরা দুষছেন পাইকারদের, আর পাইকাররা দেখাচ্ছেন নানা অজুহাত।

করোনা পরবর্তী পরিস্থিতিতে বহু মানুষেরই হয় চাকরি নেই, অথবা কর্মক্ষেত্রে কাজের সঙ্কোচন ঘটেছে। ফলে উপার্জন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। এই অবস্থায় দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে অনেকের।

বুধবার (২৫ অক্টোবর) ফেনী শহরের বড় বাজার, পৌর হকার্স মার্কেট, দাউদপুর তরকারি আড়ৎ ও মুক্ত বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এইসব তথ্য জানা গেছে।

বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, আটা, চিনি, মাছ, ডিম থেকে শুরু করে শাক-সবজি এমন কোনো নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেই, যার দাম বাড়েনি বা বাড়ছে না। বাজারজুড়ে মিলছে শীতের সবজি। কিন্তু ভরা মৌসুমেও তার দাম আকাশ ছোঁয়া। সিম, মিষ্টি আলু ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা গত বছর এই সময় ছিল ২০-২৫ টাকা কেজি। চালের দামও ভরা মৌসুমে ঊর্ধ্বমুখী। সম্প্রতি বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসেব মিলছে না। নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে ক্ষোভ। হতাশায় নিমজ্জিত খেটে খাওয়া মানুষের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও।

এসব বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি করলা ৯০, চিচিঙ্গা ৮০, শসা ৬০, ঢেঁড়স ৭০, মিষ্টি কুমড়া ৫০, প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা, পটল ৮০ টাকায়, ধুন্দুল ৮০ টাকায়, লাউ প্রতি পিস ৭০ থেকে ৯০ টাকায়, বরবটি ১০০ টাকায়, পেঁপে প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকায়, কাঁচা কলা হালি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়, জালি কুমড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে মাছ, মাংস ও ডিমের দামও ঊর্ধ্বগতি। গরুর মাংস মানভেদে কেজি প্রতি ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা, কক মুরগি ৩২০ টাকা, আকারভেদে প্রতি কেজি রুই মাছ সাড়ে তিনশ থেকে সাড়ে চারশ, মৃগেল ২৮০ থেকে ৪০০, পাঙ্গাস ২০০ থেকে ২৪০, চিংড়ি প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এক ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকায়, হাঁসের ডিম ২১৫ ও দেশি মুরগির ডিমের হালি ৭৫ টাকা।

ফেনীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত আবুল হোসেন নামে এক শিক্ষক বলেন, সবচেয়ে ভালো হতো যদি না খেয়ে থাকতে পারতাম। কিন্তু না খেয়ে তো থাকতে পারি না। চাহিদা বেশি থাকলেও বাজারে গিয়ে অল্প কিছু পণ্য নিয়ে বাসায় ফিরতে হচ্ছে। পরিবারে আগের চেয়ে দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহারের পরিমাণও কমিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছি।

আবদুল্লাহ নামে আরেকজন বলেন, দাম বৃদ্ধিতে হাতের নাগালের বাইরে সাধারণের বাজার দর। এখন তো সারাবছরই দাম বেশি। আমরা নিরুপায় হয়ে অল্প কিছু পণ্য নিয়ে বাজার থেকে ফিরছি। বাজারদর নিয়ন্ত্রণে কারো মাথাব্যথা নেই। যে যেভাবে পারছে দাম নির্ধারণ করতেছে।

দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে মাজহারুল হক জিসান নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, আগে আমরা মধ্যবিত্তরা কিছু না খেলেও ডিম, আলু, ডাল দিয়ে কোনোমতে দুবেলা খেতে পারতাম। এখন এক কেজি আলু ৫০ টাকা, একটি ডিম ১৩ টাকা। দাম বাড়লেও আয় আগের মতোই স্থির আছে। আমাদের সীমিত আয়ে সংসার চালোনো বেশি কষ্টকর। মাস শেষে এখন সঞ্চয় দূরের কথা, ধারদেনা করে চলতেও কষ্ট হয়।

আহমেদ রুবেল নামে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, সামাজিক অবস্থানের কারণে কোথাও চাইতেও পারি না। প্রাইভেট পড়িয়ে মাস শেষে যে পরিমাণ টাকা পাচ্ছি তা দিয়ে মাসের অর্ধেক চলতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আজিজুল হক নামে এক খুচরা ব্যবসায়ী বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে মাল পাওয়া যায় না। আমরা কেনা দামের ওপর নির্ভর করে বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করি। আহামরি লাভ করি এমনও না।

ফেনী বড় বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলাম বলেন, জেলা পর্যায়ে আমাদের করার তেমন কিছু নেই। কেনার ওপর আর দেশীয় বাজারদরের ওপর ভিত্তি করে আমরা দাম নির্ধারণ করি।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, উৎপাদনের উৎস থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত অনেক স্তর রয়েছে। উৎপাদনকারী ন্যায্য মূল পাচ্ছে না। অথচ ভোক্তাকে অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর মধ্যে মধ্যসত্বভোগী একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া বিপনন ব্যবস্থা দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্থ থাকায় সাধারণ মানুষ কষ্ট ভোগ করছে। পুরো বিপনন ব্যবস্থার মধ্যে যে অব্যবস্থা রয়েছে তা সরকারকে দূর করতে হবে।

অন্যদিকে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিকার অধিদপ্তরের দাবি বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে তারা। ফেনী জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (অ.দা.) মো. কাউছার মিয়া জানান, দ্রব্যমূল্য যেন ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে থাকে, কেউ যেন কারসাজি করতে না পারে সে বিষয়টি মাথায় রেখে বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে।