শ্যামনগর উপকূল অঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার

শেখ আল মামুন,সাতক্ষীরা প্রতিনিধি।।

সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়েছে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনপদ।আল্লাহর রহমতে এবার জানমালের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হলেও প্রতি ঘূর্ণিঝড় শেষে উপকূলীয় এলাকার মানুষ কতগুলি সাধারণ সমস্যায় নিপতিত হয়।

প্রথমত, যাদের ক্ষতির পরিমাণ বেশি,তাদের আগে পুনর্বাসন করা জরুরি হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত,ঘূর্ণিঝড়ে বিভিন্ন বাঁধ ভেঙে গেলে বিভিন্ন জনপদ সমুদ্রের লোনা পানিতে প্লাবিত হয়।এই পানি যতদিন থাকে,ততদিন এইসকল এলাকায় দেখা দেয় তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট।

বর্তমানে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট প্রভৃতি স্থানে তাপমাত্রা বাড়ার পাশাপাশি এই সংকট দিনদিন ঘনীভূত হচ্ছে।ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মোবাইল ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে যে খাওয়ার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে,তার জন্য প্রতিদিন নারী-পুরুষ ও শিশুদের লাইন ক্রমেই দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হচ্ছে।

বাঁধভাঙা পানিতে বিপর্যস্ত জনপদের মানুষের এখন একটাই আর্তি—‘আমাদের আগে খাওয়ার পানি দাও’। ভাত-রুটি না খাইলেও কয়েক দিন কাটানো যায়; কিন্তু পানি ছাড়া এক বেলাও যে চলে না! পানির অপর নাম জীবন এবং এই জীবন রক্ষায় এখন পানির জন্য হাহাকার চলছে এইসকল এলাকায়।

বাঁধভাঙা পানিতে গ্রামের পর গ্রাম ডুবে যাওয়ার কারণে বাড়ির নলকূপগুলি এখন ব্যবহারের অনুপযোগী ও অকেজো।কেবল সাতক্ষীরা জেলায় এইরূপ ৭২৯টি নলকূপ রয়েছে। এই অবস্থায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ অধিক উপদ্রুত শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায় চারটি মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিভিন্ন পুকুর-ডোবার পানি শোধন করে প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ হাজার লিটার পানি সরবরাহ করছে;কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। নষ্ট হওয়া নলকূপগুলি দ্রুত মেরামত করতে পারলে এলাকাবাসীর কষ্ট অনেকটা লাঘব হবে।তবে এই দুর্ভোগের মূল কারণ বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লোনা পানির প্রবেশ, লতাই বাঁধগুলি সংস্কারেও মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।

অনেক বেড়িবাঁধ এক দশক ধরেও তেমন মেরামত করা হয় না। সম্প্রতি সারাদেশে কিছু বেড়িবাঁধ সংস্কারের কাজ হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী তার সুফলও পাচ্ছে; কিন্তু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরপরই ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধগুলির তালিকা তৈরি করে তা সংস্কারের কাজ যথাসম্ভব দ্রুত শুরু করতে না পারলে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড় হিসাবে তা একসময় বড়ো ধরনের বিপর্যয় তৈরি করে। এই ব্যাপারে চিঠির পর চিঠি দেওয়া হলেও কুম্ভকর্ণের যেমন সহজে ঘুম ভাঙে না, লতেমনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেরও টনক নড়ে না যা সত্যি দুঃখজনক।

আইনগত ভিত্তি না থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রয়েছে টাস্কফোর্স। এই টাস্কফোর্সের কাজটা আসলে কী তা স্পষ্ট নহে। এক প্রকার হতাশা হতে এটি তৈরি করা হয়েছে বললেও অত্যুক্তি হয় না এবং এর কারণে কাজের আরো ধীরগতি পরিলক্ষিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দেখা যায়, রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে চুন হইতে পান খসলেই তাদের দায়ী করা হয় এবং প্রচারমাধ্যমগুলি এই ব্যাপারে হয়ে উঠে সরব ও সোচ্চার; কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার ঘটনা বৎসরের পর বৎসর ধরে ঘটতে থাকলেও তাহার সুরাহা বা প্রতিকার খুব কমই হয়।

সাধারণ মানুষ জেগে না উঠলে এই ধরনের অচেতন কর্মকাণ্ড চলতেই থাকবে। দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার নাগরিকদের জন্য সুপেয় পানি সরবরাহে ইতিমধ্যে বড়ো বড়ো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে সত্য, তবে এর সাথে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করিলতে হবে। মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের সংখ্যা বৃদ্ধি এইক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হতে পারে।