নরমাল ডেলিভারি নিয়ে আমাদের অসচেতনতা

ডাঃ রেহানা আলম,চট্টগ্রাম।।

আমাদের দেশের প্রসূতী সেবাই এমন একটি  ব্যবস্থা এখনো চলমান ( খালা )  যেটি  একজন প্রসূতী মা এবং তার গর্ভের শিশু দুজনের জন্যই হুমকি। তারপর ও বেশির ভাগ গর্ভবতী মায়ের গর্ভকালীন  এবং ডেলিভারির সময়ের বিশেষ একটি জায়গা জুড়ে থাকে সেই পাশের বাড়ির খালা। এই সুযোগে দেশের বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ  জায়গায় অনেকে গড়ে  তুলেছেন নামসর্বস্ব ডেলিভারি সেন্টার, যেখানে ডাক্তার ত থাকেইনা আয়া খালা আর নামমাত্র স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে চালানো হয় নিম্নমানের আয়রন, ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট বিক্রির রমরমা ব্যবসা আর ডেলিভারি করানোর নামে চালানো হয় অক্সিটোসিন ( Linda DS) নামক হরমোনের অপব্যবহার। যেটি একজন গর্ভবতী মা এবং গর্ভের শিশু দুজনের জন্যই অনিরাপদ। এই  অক্সিটোসিন ( Linda DS) নামক হরমোনের অনিয়ন্ত্রিত / অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারনে নিরাপদ ডেলিভারি ত হয়না বরং ডেলিভারির সময় বড় ধরনের জটিলতা / বিপদের অাশংকা থাকে যেমন – ১।  মায়ের জটিলতা – অতিমাত্রায় অক্সিটোসিন (  Linda DS) ব্যবহারের ফলে মায়ের Water Intoxication ( মায়ের শরীরের পানি কে বের হতে না দেয়া) হয়,  যার ফলে মায়ের অতিমাত্রায় খিচুনি হতে পারে, কোমায় চলে যেতে পারেন মা এমনকি একজন মায়ের মৃত্যু ও হতে পারে।

– Uterine rupture ( জরায়ু ফেটে যেতে পারে)।

– PROM ( Premature Rupture Of Membrane) সময়ের আগে পানি ভেঙে যেতে পারে।

এমন কি যদি ডেলিভারির সময় মায়ের উচ্চতা, বাচ্চার ওজন এসব না দেখে  অক্সিটোসিন ব্যবহার করা হয় তাহলে Obstracted Labour ( ডেলিভারির পথে বাচ্চা আটকে যাওয়া) হতে পারে।

এগুলো সব মেডিকেল ইমারজেন্সি যেখানে মা এবং বাচ্চা দুজনের ই মৃত্যু ঝুকি থাকে।

২। বাচ্চার জটিলতা – অতিমাত্রায় অক্সিটোসিন ব্যবহারের ফলে Foetal Distress ( জরায়ুর অতিরিক্ত চাপের কারনে বাচ্চা হার্ট রেট কমে যেতে পারে / বেড়ে যেতে পারে) জরায়ুর ভিতর  বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হয় এমনকি দ্রুত ব্যবস্থা না নিতে পারলে বাচ্চা মারা ও যেতে পারে যেটাকে মেডিকেল ভাষায় বলা হয় ( IUD), অনেক সময় বাচ্চার জীবন সংকটাপন্ন হলে  এনআইসিইউ তে নিয়ে যাওয়া লাগে যেখানে একজন অভিভাবকের বড় রকমের অার্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে।

জনসাধারণের মাঝে একটি ভুল ধারনা সবসময় দেখা  যায় যে মেডিকেলে গেলে সাথে সাথে সিজার করে ফেলেন, সেখানে আপনাকে বুঝতে হবে আপনি কোন অবস্থায় মেডিকেলে গিয়েছেন??? হয়ত আপনি এমন সব চিকিৎসা নিয়ে মেডিকেলে গিয়েছেন যেখানে মা এবং বাচ্চা উভয়কে বাচাঁতে সাথে সাথে সিদ্বান্ত নেওয়া  ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা। এখানে আমার কয়েকটি ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি –

১) তখন ভোর ৪টা আমার বাসার সামনে একটা লম্বা আকারের টেক্সি এসে দাঁড়াল আমি সামনে যেতেই দেখলাম রুগী টেক্সিতে লম্বালম্বি শোয়া আর একজন খালা পাশে বসে আছে বুঝতে আর দেরি হলনা Obstracted Labour ( বাচ্চা আটকে গেছে)  Breech Presentation ( উল্টা পজিশন) ছিল এই অবস্থায়  অতিমাত্রায় অক্সিটোসিন (Linda DS) দিয়ে  সারারাত টানাটানি করে ডেলিভারি করানোর চেষ্টা করেছে, এখানে আমার কিছুই করার ছিলনা সিএমসি তে রেফার করে দিলাম এবং ওইদিন ইমারজেন্সি ওটি এরেঞ্জ করে এই রুগির সিজার করা হয়, আর বাচ্চার ঠায় হয় এন আইসিইউ তে।

২) একদিন সন্ধায় চেম্বারে বসা অবস্থায় একটা ফোন আসল আপা আমি একটা রুগী পাঠাচ্ছি একটু দেখিয়েন কিছুক্ষণ পর রুগী এসে হাজির, কি সমস্যা??? বাসায় খালা ডেলিভারি করেছে ২দিন আগে বাচ্চা জন্মের সময় মারা গেছে, এখন মায়ের অবস্থা ও খারাপ ডেলিভারির সময় অনেকটা জায়গা ছিড়ে গেছে, কি আর করা দেখলাম, এমন খারাপ ভাবে ছিড়েছে যে কিছুই বুঝা যাচ্ছেনা, আমি চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিলাম, বললাম যদি ২৪ ঘন্টার মধ্যে আসতেন আমি সেলাই করে দিতাম, অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে এখন আর করা যাবেনা, ৩মাস পর আসিয়েন,খারাপ লাগল,  বুঝতে পেরেছি খুব গরিব আর অসচেতন,  আমার ও কিছু করার  ছিলনা।

বুঝিনা মানুষ সাধারণ জ্বর হলেও ডাক্তারের কাছে যায় কিন্তু একটা ডেলিভারির মত জটিল কাজে কেন যে আমাদের দেশের মানুষ পাশের বাসার খালার ওপর দায়িত্ব দিয়ে দেয়!

আসুন আমরা সবাই মিলে আমাদের মায়েদের এভাবে অবহেলা না করি,গর্ভকালীন সময়ে পর্যাপ্ত যত্ন নিই,চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলি,মা এবং নবজাতক দুজনকেই নিরাপদ রাখি।

ডাঃ রেহানা আলম।

প্রধান চিকিৎসক।

জে. কে. হেলথ্ কেয়ার সেন্টার।