সর্বস্তরের মানুষকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন ঝর্ণাধারা চৌধুরী

সফিকুল ইসলাম:
সর্বস্তরের মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালবাসা, রাষ্ট্রীয় সম্মান আর শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে চলে গেলেন সমাজ কর্মী, শান্তিকর্মী, সাদা মনের মানুষ, গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সম্মানিত সচিব শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী (৮০)।
বৃহস্পতিবার(২৭ জুন, ২০১৯ খ্রিঃ) তারিখে সকাল ০৬:৩৫ ঘটিকায় ঢাকায় স্কয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
গান্ধীবাদী নীতিকে জীবনের একমাত্র আদর্শ করে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন মানবসেবায়। আমরণ কাজ করে গেছেন সমাজের আপামর মানুষের জন্য। নোয়াখালীতে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিব হিসেবে কাজ করে গেছেন জীবনের শেষ পর্যন্ত।
তাঁর প্রতি সম্মান- শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বৃহস্প্রতিবার(২৭ জুন, ২০১৯ খ্রিঃ) সকাল ১১:০০ ঘটিকায় শবদেহ ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নেওয়া হয় এবং পরে স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। শুক্রবার(২৮ জুন,১৯) সকাল ১১:০০ থেকে ১২:০০ ঘটিকা পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান প্রদর্শন করতে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন পেশাজীবি নারী পুরুষ এবং সর্ব সাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সমবেত হলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।সেখান থেকে পরিচালক রাহা নব কুমার স্যারের নেতৃত্বে তাকে বহনকারী গাড়ী বহর পুলিশ স্কট সহ নোয়াখালী জেলায় প্রিয় কর্মস্থল জয়াগস্থ গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট প্রধান কার্যালয়ে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নিয়ে আসা হয়। নোয়াখালীতে গান্ধী আশ্রমে তাঁর মরদেহে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ।শ্রদ্ধা নিবেদনে এসে মহীয়সী এই নারীর আদর্শের কথা স্মরণ করেন অনেকেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনার আদর্শকে অনুসরণ করলে ঝর্ণাধারা চৌধুরির স্মৃতির প্রতি যথাযত শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে।’
ঝর্ণা ধারা চৌধুরী লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের কালুপুর গ্রামে ১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা গান্ধী অনু্সারী মি. প্রমথ চৌধুরী ও মা আশালতা চৌধুরীর ১১ সন্তানের মধ্যে তিনি দশম। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৫৬ সালে গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত অম্বিকা কালিগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্টে (গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট) যোগ দেন।১৯৬০ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সংসারত্যাগীদের সংগঠন চট্টগ্রামের প্রবর্তক সংঘে যোগদানের মাধ্যমে সরাসরি মানবসেবায় নিয়োজিত হন। এর পাশাপাশি তিনি তাঁর পড়ালেখাও চালিয়ে যান। চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আগরতলায় ত্রাণ কাজে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৭৯ সালে পুনরায় গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টে ফিরে আসেন এবং চারু চৌধুরীর মৃত্যুর পর তিনি গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিবের দায়িত্ব পান।
ঝর্ণা ধারা চৌধুরী ২০১৫ সালে সমাজসেবায় একুশে পদক, ২০১৩ সালে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রী লাভ করেন। ২০১৩ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক রোকেয়া পদক পান। এছাড়াও তিনি সমাজকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক ‘বাজাজ পুরস্কার’, ২০০২ সালে নারী উদ্যোক্তার স্বীকৃতি হিসেবে ‘অনন্যা’ পুরস্কার, ২০০৩ সালে নারীপক্ষ দুর্বার নেটওয়ার্ক, নিউইয়র্কের ওল্ড ওয়েস্টবেরি ইউনিভার্সিটির শান্তি পুরস্কার, শান্তি, সম্প্রীতি ও অহিংসা প্রসারে ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শান্তি পুরস্কার’ লাভ করেন তিনি।
মহীয়সী নারী শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী বেঁচে থাকবেন মানুষের হৃদয়ে! তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
